❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
২০২৪-এ শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পেছনে তাঁর চারপাশে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ‘চট্টগ্রাম বলয়’ এবং শীর্ষ সামরিক-গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ওপর অন্ধ নির্ভরতা মূল ভূমিকা রেখেছে। এই কর্মকর্তারা ‘সূক্ষ্ম কৌশলে’ তাঁকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে পুরোপুরি নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলেন এবং চূড়ান্ত মুহূর্তে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এ সাংবাদিক এনায়েত কবিরের লেখা ‘বাংলাদেশের মুখোশ উন্মোচন’ সিরিজের একটি প্রতিবেদনে (পর্ব ৭) এসব চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ থাকলেও শেখ রেহানা ও সালমান এফ রহমানের পরামর্শে শেখ হাসিনা সেনাপ্রধান, ডিজিএফআই ও এনএসআই প্রধানদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করে ফেলেন।
নির্বাচনের আগে থেকেই শেখ হাসিনার চারপাশে একটি শক্তিশালী ‘চট্টগ্রাম বলয়’ গড়ে উঠেছিল। এই বলয়ের মূল কুশীলব ছিলেন:
- প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি মোহাম্মদ কায়কোবাদ (চট্টগ্রাম)
- এনএসআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসাইন আল মোর্শেদ (হাটহাজারী, বিএনপি নেতা মোরশেদ খানের ভাগ্নে-জামাই)
- ডিজিএফআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদুল হক (কক্সবাজার)
- সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবির আহমেদ
- প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান (হামিদুল হকের পরামর্শে নিয়োগ)
রাজনৈতিক নেতাদের পরিবর্তে এই কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাই ছিল শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সালমান এফ রহমানকেও এই বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ১৬ই জুলাই ২০২৪ থেকেই ডিজিএফআই ও এনএসআই সরকারের বিপক্ষে কাজ শুরু করে এবং আন্দোলনকে সশস্ত্র সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ডিবি কার্যালয়ে ৬ জন ছাত্র সমন্বয়ককে আটকে রেখে জোরপূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতিতে স্বাক্ষর করানোর ঘটনাটি ছিল গোয়েন্দাদের পাতা ‘আত্মঘাতী ফাঁদ’, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশে বলা হয়, ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনাকে গণভবনে উন্মত্ত উগ্রবাদীদের ভিড়ে ফেলে হত্যার একটি ছক কষা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশে ‘যুদ্ধপরিস্থিতি’ তৈরি করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের হস্তক্ষেপের বৈধতা আদায় করা। তবে ভারতের এক শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার সময়োচিত হস্তক্ষেপে এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
৫ই আগস্ট দুপুরে আর্টিলারি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার রফিকের নির্দেশে উত্তরা এলাকার কারফিউ ব্যারিকেড হঠাৎ তুলে নেওয়া হলে আন্দোলনকারীদের ঢাকায় প্রবেশের পথ সুগম হয় এবং সরকারের পতন নিশ্চিত হয়।
শেখ হাসিনা ভেবেছিলেন নিরাপত্তার কারণে তাঁকে টুঙ্গিপাড়ায় নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) পাহারায় কুর্মিটোলার বাশার ঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে এবং ক্ষমতা আর তাঁর হাতে নেই।
৫ই আগস্ট সকালেই বাংলাদেশ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর কাছ থেকে সামরিক বিমানের ভারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশের অনুমতি নিয়ে রেখেছিলেন। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে দ্রুত দিল্লিতে পাঠানো হয়।
ভারতীয় কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে তাঁদের নিরাপদে স্থানান্তর করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস ওই শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি রামু সেনানিবাসকে জাতিসংঘের স্থায়ী শান্তিরক্ষা ঘাঁটিতে রূপান্তর এবং রাখাইন অঞ্চলে সামরিক করিডোর তৈরির বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
পতনের পর সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আইএসপিআর-এর আশ্রয় তালিকায় বৈষম্য ছিল। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে যশোর সেনানিবাস থেকে ভারতে পালাতে সহায়তা করা হয়।
সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা মেজর জেনারেল আকবর হোসাইন এতে সহায়তা করেন বলে দাবি করা হয়।
সেনাবাহিনী বিচার বিভাগকে রক্ষা না করে শুধু রাষ্ট্রপতির সুরক্ষায় মনোযোগ দেয়, যার ফলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অরাজকতার মুখে পড়ে। জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনর্বাসনও এই পরিবর্তনের অন্যতম ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে এসব ঘটনাকে ‘রেজিম চেঞ্জ কনস্পিরেসি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সামরিক-গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কৌশলগত ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন হিসেবে উপস্থাপিত, যা বিভিন্ন ঘটনার সূত্র ধরে সাজানো।
