বিশেষ প্রতিবেদক
ওয়াশিংটন, ২২ মার্চ ২০২৬ (নিজস্ব প্রতিবেদক): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী শক্তির চালানো হত্যাযজ্ঞকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। এই প্রস্তাবটি (H.Res. 1130) ওহাইয়োর ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান ২০ মার্চ ২০২৬ তারিখে (শুক্রবার) উপস্থাপন করেন, যা বর্তমানে হাউজের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক চালানো নির্মম হত্যাযজ্ঞকে আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যা (Genocide) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার এবং বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধপন্থী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে অবিরাম করে আসছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই দাবিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জোরদার করে তোলে—জাতিসংঘে বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ফোরামে সেমিনার-সম্মেলন, ইউএন হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে প্রস্তাব উত্থাপন, এমনকি পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপন করে।
২০১৭ সালে জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে বলেন যে, ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া এই গণহত্যায় ৩০ লাখ নিরীহ মানুষ নিহত এবং ২ লাখেরও বেশি নারী নির্যাতিত হয়েছে—এটি জাতিসংঘের গণহত্যা সনদ অনুযায়ী স্পষ্ট গণহত্যা। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠনগুলো—যেমন ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন ডায়াসপোরা গ্রুপ (যেমন BASUG, International Forum for Secular Bangladesh)—ইউরোপ-আমেরিকায় র্যালি, সেমিনার, লবিং এবং ইউএন-এ প্রতিনিধিত্ব করে এই স্বীকৃতির জন্য অবিরাম চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই দাবির ফলশ্রুতিতে মার্কিন কংগ্রেসে একাধিক রেজোলিউশন (যেমন ২০২২-এ H.Res.1430 এবং সাম্প্রতিক H.Res.1130) উত্থাপিত হয়েছে, যা পাকিস্তানি বাহিনী ও জামায়াতে ইসলামীর মতো সহযোগীদের ভূমিকা তুলে ধরে গণহত্যার স্বীকৃতি ও সংখ্যালঘু সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। এই দীর্ঘ সংগ্রাম শুধু ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধের লড়াই—যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে বিশ্বমঞ্চে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার অব্যাহত প্রচেষ্টা।

এবারের প্রস্তাবটির শিরোনাম “Recognizing the Bangladesh Genocide of 1971 and protection of religious minorities in Bangladesh”। এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অপারেশন সার্চলাইট-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত সন্ত্রাসী অভিযান চালায়। এতে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি ঘটানো হয়, যা জাতিসংঘের গণহত্যা সংজ্ঞা (UN Genocide Convention) অনুযায়ী স্পষ্টতই গণহত্যা। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নির্মূল অভিযান চালানো হয়, যা ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের চরম উদাহরণ।
কংগ্রেসম্যান ল্যান্ডসম্যান বলেন, “ইতিহাস সত্যের দাবি করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে সন্ত্রাসী অভিযান শুরু করে—যা মার্কিন কূটনীতিক, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দ্বারা নথিভুক্ত—তা জাতিসংঘের গণহত্যার সংজ্ঞা পূরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগেই এই হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামপন্থি গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। প্রস্তাবে এসব সহযোগী শক্তির দায় নির্ধারণ করে বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
- পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালায়।
- সমস্ত ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর বাঙালি এর শিকার হলেও হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়।
- এই অপরাধগুলোকে war crimes, crimes against humanity এবং genocide হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি।
- বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের (বিশেষ করে হিন্দু) সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব।
- পুরো জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দায়ী না করে শুধু অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এই প্রস্তাবটি গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে ‘হিন্দু অ্যাকশন’ সংস্থার আয়োজিত শুনানির ধারাবাহিকতায় এসেছে, যেখানে ১৯৭১-এর গণহত্যা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রস্তাবটি পাস হলে ১৯৭১-এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও জোরদার হবে, পাকিস্তানি বাহিনী ও জামায়াতে ইসলামীর মতো সহযোগীদের ভূমিকা নতুন করে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসবে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সত্য আরও প্রতিষ্ঠিত হবে।
এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি, কারণ এর আগেও মার্কিন কংগ্রেসে (যেমন ২০২২ সালে H.Res.1430) অনুরূপ প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, কিন্তু এবার জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও সংখ্যালঘু সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটির অগ্রগতি এখন ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির ওপর নির্ভর করছে, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে তুলে ধরার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
