৪০ বছর পর সংসদের শীর্ষ পদে নারীশূন্যতা: এরশাদের পথে হাঁটলেন তারেক

৪০ বছর পর সংসদের শীর্ষ পদে নারীশূন্যতা: এরশাদের পথে হাঁটলেন তারেক
শেয়ার করুন

অজয় বাঙালী, বিডি ডাইজেস্ট

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সংসদের শীর্ষ পদগুলোর কোনোটিতেই এবার নারী নেই। প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও সংসদীয় পদই এখন পুরুষদের দখলে।

এবারের সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

এমনকী ডেপুটি স্পিকার পদেও বসেছেন আরেক পুরুষ জনপ্রতিনিধি কায়সার কামাল।

প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। কারণ ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সংসদেই কোনো না কোনো শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্ব ছিল। এর আগে কেবল ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদে এমন পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।

সে সময় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ–এর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেশের প্রধান দুই বিরোধী দল অংশ নেয়নি। ফলে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় নারী নেতৃত্বেরও উপস্থিতি ছিল না। চার দশক পর আবারও সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে নারীর অনুপস্থিতি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তৃতীয় সংসদে শেখ হাসিনাকে শুরু নারী নেতৃত্বের

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নারীর শীর্ষ নেতৃত্বের সূচনা ঘটে ১৯৮৬ সালে। ওই বছর তৃতীয় জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবার কোনো নারী সংসদের অন্যতম শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন।

তৃতীয় জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং স্পিকার ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী

চতুর্থ সংসদ: এরশাদের নিয়ন্ত্রিত সংসদে ছিল না নারী

১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিতর্কিত একটি নির্বাচন হিসেবে পরিচিত। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি।

ফলে এরশাদ সরকার বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের জন্য আ স ম আবদুর রব–এর নেতৃত্বে একটি ছোট দলকে সামনে আনে। সংসদ নেতা ছিলেন এরশাদ এবং স্পিকার ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। সে সংসদে কোনো নারী শীর্ষ পদে ছিলেন না।

১৯৯১ থেকে শুরু নারী নেতৃত্বের যুগ

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। ওই সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া এবং বিরোধী দলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা। স্পিকার ছিলেন শেখ রাজ্জাক আলী

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা—দুই শীর্ষ রাজনৈতিক পদেই নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। স্পিকার ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

দুই নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দীর্ঘ সময়ের রাজনীতি

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া এবং বিরোধী দলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা। স্পিকার ছিলেন জামির উদ্দিন সরকার

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। স্পিকার ছিলেন আবদুল হামিদ

স্পিকারের পদেও নারী নেতৃত্ব

২০১৩ সালে সংসদের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ওই বছর শিরীন শারমিন চৌধুরী বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন।

তিনি নবম সংসদের শেষ সময় থেকে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং পরে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদেও একই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন রওশন এরশাদ এবং স্পিকার ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদেও সংসদ নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং স্পিকার ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী।

ফলে ওই সময় সংসদের প্রধান চারটি পদ—প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা ও স্পিকার—সবগুলোতেই নারী নেতৃত্ব দেখা যায়।

দ্বাদশ সংসদেও নারী নেতৃত্বের পরে এবার শীর্ষপদে নেই নারী

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন জি এম কাদের এবং স্পিকার ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী।

অর্থাৎ এই সংসদেও শীর্ষ পদগুলোর দুইটিতে ছিলেন নারী, আর একটিতে ছিলো পুরুষ প্রতিনিধি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই দীর্ঘ ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে। নতুন সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তারেক রহমান

এবারের সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

এমনকী ডেপুটি স্পিকার পদেও বসেছেন আরেক পুরুষ জনপ্রতিনিধি কায়সার কামাল।

ফলে প্রায় ৪০ বছর পর জাতীয় সংসদের শীর্ষ পদগুলো থেকে নারীর উপস্থিতি পুরোপুরি অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে।

প্রশ্নে নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নারী নেতৃত্বের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ছিল। টানা তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নারী নেতৃত্ব থাকার পর হঠাৎ করেই সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে নারীর অনুপস্থিতি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তাদের মতে, সংসদের শীর্ষ পদে নারীর উপস্থিতি কেবল প্রতীকী নয়; এটি দেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

চার দশক আগে এরশাদের আমলে যে বাস্তবতায় সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে নারী অনুপস্থিত ছিল, ত্রয়োদশ সংসদের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের কাছে সেই সময়ের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

Visited 50 times, 1 visit(s) today