যেভাবে এবং যার কৌশলে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ভিডিও রিল রক্ষা পেয়েছিল

যেভাবে এবং যার কৌশলে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ভিডিও রিল রক্ষা পেয়েছিল
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক


ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এক ব্যক্তির কৌশল ও সাহসিকতার কারণেই ভাষণের ধারণকৃত দৃশ্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

তিনি জনপ্রিয় অভিনেতা মহিবুর রহমান খায়ের, যিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আবুল খায়ের নামে পরিচিত। বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটক ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অভিনয়ের মাধ্যমে আবুল খায়ের দর্শকদের কাছে সুপরিচিত ছিলেন।

তবে অভিনয়ের বাইরেও তিনি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন— জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের ধারণকৃত চলচ্চিত্র সংরক্ষণে উদ্যোগী হন।

আবুল খায়ের তখন সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের ডিএফপি কর্মকর্তার পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ সচল ক্যামেরা বিশেষজ্ঞও ছিলেন।

ভাষণটি তৎকালীন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর ক্যামেরায় ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মহিবুর রহমান খানের ওরফে অভিনেতা আবুল খায়েরের নির্দেশে ক্যামেরাম্যান জেড এম এ মবিন, ক্যামেরাম্যান এম এ রউফ, ক্যামেরা সহকারী আমজাদ আলী খন্দকার, ক্যামেরা সহকারী এস এম তৌহিদ, ক্যামেরা সহকারী সৈয়দ মইনুল আহসানসহ আরও দুই লাইটবয় সেসময়ের রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছান।

ভাষণ ধারণ করতে দুটি ক্যামেরা ব্যবহৃত হয়। মূল ভাষণ রেকর্ড করতে একটি এবং অন্যান্য ফুটেজ নিতে আরেকটি ক্যামেরা কাজ করে। মূল ভাষণের শব্দ রেকর্ড করার কাজে ছিলেন সৈয়দ মইনুল।

মঞ্চের কাছে দুটো নাগরা (শব্দ ধারণ যন্ত্র) স্থাপন করা হয়। যাতে বঙ্গবন্ধুর একটি কথাও বাদ না পড়ে। তবে একটিই যন্ত্রতেই পুরো ভাষণ রেকর্ড হয়ে যায়।

ভাষণ শেষে শব্দ ধারণ যন্ত্র ও ভিডিও ক্যামেরা খুব সবাধানে সচিবালয়ের ফটক দিয়ে বের করার সময় এক পাকিস্তানি সেনা টেকনিশিয়ানদের ধরেন। তখন তাদের কাছে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড দেখিয়ে পাহার থেকে কৌশলে বেরিয়ে যান।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতের পর চলচ্চিত্র বিভাগের তৎকালীন পরিচালক/কম্পট্রলার মহিবুর রহমান খায়ের আশঙ্কা করেন যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৭ই মার্চের ভাষণটির কপি নষ্ট করে ফেলতে পারে। তাই তিনি ভাষণের মূলকপি ও অডিও রেকর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেন। এ সময়ে ফিল্ম ডিভিশনের অফিস ছিল সচিবালয়ের ভেতরের টিন শেডে।

এপ্রিল মাসের শুরুতে এসব গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ ও অন্যান্য ডকুমেন্ট ৪২ইঞ্চি মাপের একটি স্টিলের ট্রাংকে নিয়ে তিনি সহকারি চিত্রগ্রাহক আমজাদ আলী খন্দকারকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

তার নির্দেশে জনাব আমজাদ আলী খন্দকার ১৯৭১ সালের ৯ই এপ্রিল ভাষণের অডিও-ভিডিও ফুটেজসহ স্টিলের ট্রাংকটি বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে নেওয়ার উদ্দেশে বেবিট্যাক্সিতে করে সোয়ারিঘাটে যান। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কড়া টহলের মধ্যেও জনাব আমজাদ আলী খন্দকার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জিঞ্জিরা হয়ে মুন্সিগঞ্জের জয়পাড়ায় মজিদ দারোগা বাড়িতে ট্রাংকটি নিয়ে যান।

পেছন পেছন যান মহিবুর রহমান খায়েরও সেখানে যান। তারা ভাষণের রিল ও অন্যান্য ডকুমেন্ট ভর্তি ট্রাংকটি অত্যন্ত সাবধানে সেখানে মাটি খুঁড়ে গর্তে লুকিয়ে রাখেন। তারপর বিয়ের বরযাত্রার ছদ্মবেশে একটি নৌকা বা লঞ্চ সাজানো হয়। সেই লঞ্চে করে রেকর্ডগুলো আগরতলায় পৌঁছে দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেখান থেকে ট্রাংকটি এনে আবারও মূল অফিসের স্টোরে সংরক্ষণ করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর জন্মদিনে এ ধারণকৃত অডিও-ভিডিও তাঁকে উপহার দেওয়া হয়েছিল।

যুদ্ধ চলাকালীন সময় যেসব রেকর্ডেড কপি ভারতে পাঠানো হয়, সেখান থেকে বিশ্বখ্যাত রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভির উদ্যোগে এ ভাষণের ৩ হাজার কপি বিনামূল্যে বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করা হয়’।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ষড়যন্ত্রকারীরা ৭ই মার্চের ভাষণের রিল নষ্ট করতে চলচ্চিত্র বিভাগে তল্লাশি চালায়। চলচ্চিত্র শাখার কর্মীরা সে সময় আবারও আবুল খায়েরের কৌশলে ভাষণের মূল পিকচার নেগেটিভ ও সাউন্ড নেগেটিভসহ অন্যান্য ফুটেজ ভিন্ন একটি ছবির ক্যানে ঢুকিয়ে ফিল্ম লাইব্রেরিতে লুকিয়ে রাখেন।

স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ষড়যন্ত্রকারীরা ৭ই মার্চের ভাষণ মনে করে ভুলে অন্য রিল পুড়িয়ে ফেলে এবং ৭ই মার্চের ভাষণের আসল রিল অক্ষত থাকে। পরবর্তীতে তার যত্ন ও সংরক্ষণেই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণের দৃশ্য টিকে থাকে।

আর এভাবেই রক্ষা পায় ঐতিহাসিক এই ভাষণের দলিল। এছাড়া ৭ই মার্চের ভাষণ ধারণের স্মৃতিবাহী শব্দধারণ যন্ত্র বা নাগ্রা মেশিন এবং টু-সি ক্যামেরাটি এখনো চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে সংরক্ষিত ছিল ২০২৪-এর জুলা্ দাঙ্গার আগ পর্যন্ত। সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা যায়নি।

আবুল খায়েরের কারণেই আজকের প্রজন্ম দেখতে ও শুনতে পাচ্ছে স্বাধীনতার সেই অমর আহ্বান— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

৭ মার্চের ভাষণ, জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণসহ বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য যে সব ভাষণের ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়, তার প্রায় সবগুলোই চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের চলচ্চিত্র শাখার কলাকুশলিদের ধারণ করা। যার নেতৃত্বে ছিলেন আবুল খায়ের।

অনেকেই আবুল খায়েরকে শুধুমাত্র অভিনেতা হিসেবেই জানেন, তাদের কাছে হয়তো এই ঐতিহাসিক তথ্যটি বেশ চমকপ্রদ।

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাটকের মাধ্যমেই অভিনয় জগতে জনপ্রিয়তা লাভ করেন আবুল খায়ের। তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋতিক কুমার ঘটকের পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন।

এছাড়া, চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনি চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ৭ই মার্চের ভাষণ যেমন এক অবিস্মরণীয় দলিল, তেমনি সেই দলিল রক্ষায় আবুল খায়েরের অবদান ইতিহাসের নেপথ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য। ইউনাইটেড নেশান্স এডুকেশন, সাইন্স অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন-ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০শে অক্টোবর এ ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। ৭ই মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য গৌরব ও আনন্দের। এ স্বীকৃতির ফলে কালোত্তীর্ণ ভাষণটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যায় এবং মুক্তির পথে এগিয়ে চলতে উজ্জীবিত করবে।

সরকারের সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালনকালে ৭ই মার্চের ভাষণ ও এর ইতিহাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। তিনি এর ওপর একটি প্রামাণ্য পুস্তিকাও প্রকাশ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক হিসেবে বদলি হন।

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক হিসেবে তিনি ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ২০১৫ সালে ইউনেস্কোতে প্রস্তাব পাঠান। একই সময়ে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ লিয়াকত আলী খানও ইউনেস্কোতে আলাদা প্রস্তাব পাঠান। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, তথ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তৎকালীন পররাষ্টমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইউনেস্কোর স্থায়ী প্রতিনিধি শহীদুল ইসলামকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এরপর তথ্য মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গে পরামর্শ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্বের অন্যতম দালিলিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ইউনেস্কোতে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন প্রস্তাব পাঠায়। এসব প্রস্তাব দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ২০১৭ সালের ৩০শে অক্টোবর ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

এই ভাষণ বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণা যোগাবে। বিশ্ববাসী যুগের পর যুগ বাঙালী জাতির গৌরবোজ্জল ইতিহাস জানতে আগ্রহী হবে।

Visited 3,873 times, 1 visit(s) today