ইউক্রেন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আশঙ্কা: ইরান সংঘাতে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে

ইউক্রেন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আশঙ্কা: ইরান সংঘাতে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

ঢাকা, ৪ মার্চ ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল ও কয়লার মজুতের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ আমদানির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট এড়াতে বিকল্প পথ খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুত

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত ২০১,৬১০ টন (কিছু সূত্রে ২১৭,৩১৭ টন), যা দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে প্রায় ১৪-১৫ দিনের জন্য যথেষ্ট। পেট্রোলের মজুত ২১,৭০৫ টন (১৭ দিন), অকটেন ৩৪,১৩৩ টন (২৮-৩১ দিন), ফার্নেস অয়েল ৭৮,২৭৮ টন (প্রায় ৯৩ দিন বা দুই মাসের কাছাকাছি) এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে। বিপিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত স্বল্পমেয়াদে (২-৪ সপ্তাহ) সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সক্ষম। মার্চ-এপ্রিল মাসের জন্য ইতিমধ্যে ১৫টি করে চালানের এলসি খোলা হয়েছে এবং চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আমদানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যায়।

 

কয়লার বর্তমান মজুত

কয়লার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মজুত এক মাসের (পূর্ণ ক্ষমতায় চালানোর জন্য) বলে জানা গেছে। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য আমদানি নির্ভরতা বেশি, এবং অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে কয়লা আমদানিতে সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। সরকার ইতিমধ্যে এলএনজি ঘাটতির আশঙ্কায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে ৫,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়।

 

ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ভবিষ্যৎ

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী তেলের ২০ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা তেলের দাম ১০০ ডলার/ব্যারেল পর্যন্ত ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল এবং ১১০টির মতো এলএনজি চালান আমদানি করে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। হরমুজ বন্ধ হলে ক্রুড অয়েল ও এলএনজি আমদানিতে ব্যাপক বিলম্ব ও দাম বৃদ্ধি হতে পারে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে শিল্প ও রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে। তবে পরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ চাপ বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

 

২০২২-২৩ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সংকট মোকাবেলা

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে, যা বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। আওয়ামী লীগ সরকার তখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি স্থগিত করে দেয় (জুলাই ২০২২ থেকে), কারণ দাম অসহনীয় হয়ে ওঠে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ঘাটতি দেখা দেয়, যা লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ায়—অক্টোবরে দেশের ৭৫-৮০% এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়।

 

সরকার তখন ডিজেল-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়, ফার্নেস অয়েল-ভিত্তিক প্ল্যান্ট চালু রাখে এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে ঝুঁকে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস-শিল্পে শিডিউল করে লোডশেডিং করা হয় এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো হয়। তেলের দামও বাড়ানো হয় (পেট্রোল ৫০%+ বৃদ্ধি), যা জনরোষের কারণ হয়। সরকার দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের পরিকল্পনা করে, কিন্তু স্বল্পমেয়াদে আমদানি-নির্ভরতা ও ডলার সংকটের কারণে সংকট মোকাবেলা চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।

 

ভবিষ্যৎ জ্বালানী সংকট মোকাবেলায় বিকল্পঃ

  • স্বল্পমেয়াদি: ফার্নেস অয়েল-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রেখে এলএনজি ঘাটতি পূরণ, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • মধ্যমেয়াদি: অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আমদানি বাড়ানো; চীন-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর থেকে পরিশোধিত তেল সংগ্রহ।
  • দীর্ঘমেয়াদি: নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু) বাড়ানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং কয়লা খনন (যেমন ফুলবাড়ি) বিবেচনা। সরকার ইতিমধ্যে রিনিউয়েবল এনার্জি পলিসি ২০২৫-এ ২০৩০ সাল নাগাদ ২০% এবং ২০৪০ সালে ৩০% নবায়নযোগ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বল্পমেয়াদে কোনো সংকট নেই, তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়াতে বৈচিত্র্যময় আমদানি উৎস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে।

 

Visited 3 times, 1 visit(s) today