পুলিশি পাহারার মধ্যেই চাঁদার দাবিতে আওয়ামী লীগ নেতা-ব্যবসায়ীর বাড়িতে দ্বিতীয় দফা গুলিবর্ষণ

পুলিশি পাহারার মধ্যেই চাঁদার দাবিতে আওয়ামী লীগ নেতা-ব্যবসায়ীর বাড়িতে দ্বিতীয় দফা গুলিবর্ষণ
শেয়ার করুন

❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো


বিদেশে পলাতক শিবিরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের নির্দেশে পুলিশি পাহারায় থাকা চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী-আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসীরা।

আজ ২৮শে ফেব্রুয়ারি, শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে এই গুলি করার ঘটনা ঘটেছে।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের স্বজনরা জানান, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক শিবিরের সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা গুলি ছুড়েছে।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের ছোটভাই আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমানও এই বাড়িতে থাকেন। তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ২০২৪ সালে বাঁশখালী থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে নির্বাচিত হন।

এর আগে গত ২রা জানুয়ারি ওই বাড়িতে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। গুলিতে বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে যায়, দরজায়ও গুলি লাগে। এর পর থেকে বাসাটি পুলিশের পাহারায় ছিল। পুলিশের পাহারার মধ্যেই বাড়িটিতে আবারও গুলির ঘটনায় আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

চট্টগ্রামে চাঁদা না পেয়ে দিনেদুপুরে ব্যবসায়ীর বাড়িতে শিবির সাজ্জাদের অনুসারীদের গুলি

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করে আসছে। প্রথমে ১০ কোটি টাকা, পরে ৫ কোটি টাকা দাবি করে সাজ্জাদ। চাঁদা না দেওয়ায় গত ২রা জানুয়ারিও তার বাড়িতে গুলি করা হয়। এরপরও চাঁদা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা দেয় সাজ্জাদ। এতে লেখা হয়—‘ওয়েট অ্যান্ড সি’।

অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল এইট মার্ডার খ্যাত শিবিরের সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সকালে নামাজ পড়ে সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ বাড়ির পেছনে মুখোশধারী অস্ত্রধারীরা গুলি করতে থাকে। ৬-৭ রাউন্ড গুলি করেছে।

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড > ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মরিয়া বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা: বাড়ছে অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুদ: পর্ব-১

তিনি বলেন, সিকিউরিটি গার্ড সন্ত্রাসীদের দেখতে পেয়ে বাড়ির পাহারায় থাকা ৫-৬ জন পুলিশ সদস্যকে জানায়। তারা বাড়ির দোতলায় উঠে সন্ত্রাসীদের উদ্দেশে পাল্টা গুলি করার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই সন্ত্রাসীরা চলে যায়। সন্ত্রাসীদের হাতে পিস্তল ছাড়াও চায়নিজ রাইফেলসহ অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ছিল।

বিডি ডাইজেস্ট-এর হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশধারী চার সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে গিয়ে বাড়ি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে।

সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ জানায়, চার সন্ত্রাসীর একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়ে।

খবর পেয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের একটি দল।

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড > সক্রিয় দুই প্রজন্মের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা এবং ইতিহাস: শেষ পর্ব

পরিদর্শনের পর হোসাইন কবির ভূঁইয়া বলেন, সন্ত্রাসীরা একটি প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছিল। গাড়ি দূরে রেখে পায়ে হেঁটে বাড়ির কাছে গিয়ে গুলি করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদার জন্য বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তার লোকজন দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অস্ত্রধারীদের মুখে মুখোশ থাকায় তাদের সহজে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তবে সাজ্জাদের সহযোগী আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. রায়হান ও বোরহান এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। তাদের গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।

পুলিশের দাবি পলাতক, বিএনপির প্রচারণার মঞ্চে সক্রিয় ৮ খুনের আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান

উল্লেখ্য, সন্ত্রাসী রায়হানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও তাকে খুঁজে পাচ্ছেনা পুলিশ। যদিও সম্প্রতি নির্বাচনের পূর্বে রাউজানে বিএনপির প্রার্থীর সমাবেশে তাকে প্রকাশ্যেই দেখা গেছে। তবুও তাকে গ্রেপ্তারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

প্রসঙ্গত, স্মার্ট গ্রুপ একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

গত ২রা জানুয়ারিও তাদের বাড়িটিতে গুলি করার ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল পুলিশ। তবে ঘটনার পর কোনো মামলা করা হয়নি।

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কয়েকজন

কে এই সাজ্জাদ

বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিয়াতলী এলাকার আব্দুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। আলোচনায় আসেন নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই। শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদের বিরুদ্ধে খুনসহ রয়েছে এক ডজন মামলা। যদিও শিবির নাছিরের মতো ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে একাধিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সাজ্জাদও শিবিরের কেউ নয়।

বহর্দ্দারহাটের এইট মার্ডারের দৃশ্য

শিবির নাছির গ্রেপ্তারের পর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেন আরেক শিবির ক্যাডার গিট্টু নাছির। তার নির্দেশে ১৯৯৯ সালের ২রা জুন পাঁচলাইশ ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানকে বাড়ির সামনে খুন করে ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হন বড় সাজ্জাদ। মূলত এইট মার্ডারের ঘটনাটি আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার ইমেজ বাড়িয়ে দেয়। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলা থেকে খালাস পান তিনি। ২০০০ সালের ১২ই জুলাই নগরের বহদ্দারহাটে দিনেদুপুরে ব্রাশফায়ারে মাইক্রোবাসে থাকা ৬ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ ৮ জনকে হত্যা করা হয় সাজ্জাদের নেতৃত্বে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ২৭শে মার্চ দেওয়া মামলার রায়ে বড় সাজ্জাদসহ চার জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। হাবিব খানসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

চট্টগ্রামে অস্ত্র-গুলিসহ শিবিরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী ইকরাম গ্রেপ্তার

২০০০ সালের ৩রা অক্টোবর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিয়াতলীতে একে-৫৬ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে ছেড়ে দেওয়া হলে সাজ্জাদ দুবাইয়ে পালিয়ে যান। সেখান থেকে দুবাই চলে যান ভারতীয় ভুয়া নাম-পরিচয় সংগ্রহ করে। ভারতে কয়েকটি সন্ত্রাসবাদী ঘটনায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। তিহার জেলেও ছিলেন অনেকদিন। ভারতে বিয়ে-সংসার করেন। দুবাইয়ে রয়েছে তার মাফিয়া সাম্রাজ্য।

তার অধীনে মানি লন্ডারিং এবং সোনা চোরাচালানের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। যাতে বিএনপি-জামায়াত সরকারের অনেক নেতাকর্মী ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ের জামায়াত-শিবিরের বেশ কিছু নেতাকর্মী সম্পৃক্ত রয়েছেন। রিয়াজউদ্দিন বাজার এবং টেরি বাজার কেন্দ্রিক হুন্ডি ব্যবসা, সোনা চোরাচালানের এই নেটওয়ার্ক চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম খুঁটি।

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একাংশ

শিবিরের আরেক সন্ত্রাসী নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল এক খুনে বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যায়, সরোয়ার দল ছাড়ে। গত বছরের ৫ই নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বড় সাজ্জাদকে দায়ী করা হয়।

বড় সাজ্জাদকে ধরতে আওয়ামী লীগ আমলে জারি করা ইন্টারপোলে রেড নোটিশ এখনও ঝুলছে। বড় সাজ্জাদ বিদেশে বসে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ, বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও এবং হাটহাজারী এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছেন। বাবলা হত্যার ঘটনায় সাজ্জাদসহ ৭ জনের নামোল্লেখ করে ২২ জনকে আসামি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বড় সাজ্জাদের সাথে তার গুরু শিবির নাছিরের প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। সন্ত্রাসী ইকরামের সাথে ফাঁস হওয়া এক ফোনালাপে শিবির নাছিরকে আধলা ছুড়ে মেরে ফেলবেন বলে ঠাট্টা করতে শোনা গেছে তাকে।

পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক।

নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝেই চট্টগ্রামে সহিংসতা বাড়ছে, ৪ মাসে ২২ খুন

পুলিশ জানায়, চাঁদা না পেলেই গুলি করেন সাজ্জাদের অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়।

গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত জেলায় জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছেন। আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন।

মীর হেলালের সাথে ছোট সাজ্জাদ

২০১৫ সাল থেকে দেশে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন বুড়ির নাতি খ্যাত ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বিএনপির নেতা মীর হেলালের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকলেও তার হয়ে সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে রায়হান, ইমনসহ অন্যরা।

চট্টগ্রামে বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা বা জমি বেচাকেনায় দিতে হয় কোটি টাকা, পৌঁছে যায় অস্ত্রধারীরা

পুলিশ বলছে, গত বছর বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সমালোচনা করায় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় বায়েজিদের আরেক সন্ত্রাসী আকবর হোসেন ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

চাঁদার দাবিতে এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে দাপিয়ে বেড়ায় চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীরা

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী। গত ১৫ই মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে।

এই দলে আরও রয়েছেন খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ—যাদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠান সাজ্জাদ।

Visited 188 times, 1 visit(s) today