বিদেশি গণমাধ্যমে ‘প্রগতিশীল–মধ্যপন্থী’ মুখোশ, দেশে জামায়াতের উগ্র ডানপন্থা প্রকাশ্যে

বিদেশি গণমাধ্যমে ‘প্রগতিশীল–মধ্যপন্থী’ মুখোশ, দেশে জামায়াতের উগ্র ডানপন্থা প্রকাশ্যে
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের একটি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে তুলে ধরলেও দেশের ভেতরে দলটির বিরুদ্ধে মব সহিংসতা, উগ্রবাদ এর প্রশ্রয়, রাজনৈতিক হামলা ও চরম নারীবিদ্বেষ ও ইসলামাইজেশনের চরিত্র প্রকট হচ্ছে।

ভারতের সাপ্তাহিক ইংরেজি ম্যাগাজিন দ্য উইক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জামায়াত একটি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী ইসলামী রাজনৈতিক দল, যা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের নীতিমালা সময়ের সঙ্গে পরিমার্জন করেছে। আমরা সবসময়ই গণতান্ত্রিক ও জনমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী।’

দিল্লিতে দ্য উইক-এর ব্যুরোপ্রধান নম্রতা বিজি আহুজাকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকলেও জামায়াত কখনো গণতান্ত্রিক কার্যক্রম থেকে সরে যায়নি। ২০১৮ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দলটি শিখেছে—গণতন্ত্র সংকটে পড়লে সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০১৩ সালের পর কার্যত নিষিদ্ধ পরিস্থিতিতেও জামায়াত সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে এবং রাজনৈতিক কৌশল নতুন করে সাজিয়েছে। তিনি দাবি করেন, তরুণদের একটি বড় অংশ দুর্নীতি ও অপশাসনের বিকল্প হিসেবে জামায়াতের শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামোর প্রতি আগ্রহী হচ্ছে।

নারী ও সংখ্যালঘু অধিকার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দলটি সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদায় বিশ্বাসী। সংখ্যালঘু প্রার্থী মনোনয়নের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জোটগত সমীকরণের কারণে এবার নারী প্রার্থী দেওয়া না গেলেও অন্য নারী প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন রয়েছে। অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জামায়াতের কোনো সদস্যের কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।

দেশে ভিন্ন রূপে জামায়াত

অন্যদিকে, দেশের ভেতরে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে উগ্র ডানপন্থী আচারণের অভিযোগ প্রবল হচ্ছে। নারীদের শরিয়তপন্থায় পরিচালিত করতে একদিকে যেমন ৫ ঘন্টার কর্মঘন্টা আর ৮ ঘন্টার বেতনের মতো লোভনীয় অফার দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, তেমনি জামায়াতের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যে ও সোশ্যাল মিডিয়া পোষ্টে কর্মজীবি নারীদের প্রতি প্রচন্ড বিদ্বেষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সম্প্রতি জামাতের আমিরের এক্স একাউন্টের পোষ্টে থেকে কর্মজীবি নারীদের পতিতার সাথে তুলনা করা হয়। যদিও পরবর্তিতে আমিরে-এ জামাতের পক্ষ থেকে বলা হয় আইডি হ্যাক হয়েছিল, কিন্তু বিভিন্ন জামায়াতি একটিভিস্ট আমির এর পতিতাবৃত্তির বয়ানের পক্ষে কলম তুলতে দেখা গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন অভিযোগ করছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় মব সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং নারী কর্মীদের হয়রানির ঘটনায় জামায়াত বা তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা ও ভোলায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নারী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

দলটির দাবি, নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারী কর্মীদের আটকে রাখা, গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তারা জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় কর্মীদের দায়ী করেছে।

এর আগে গত বছরের ২৮ মে বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব এলাকায় জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের মুক্তির প্রতিবাদ এবং রাজশাহীতে ছাত্রজোটের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের ডাকা মানববন্ধনে হামলা চালায় শাহবাগবিরোধী ঐক্য। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন। এদিন একজন নারীকে লাথি মারার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

লাথি মারা ওই যুবকের নাম আকাশ চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার পৌরসভা এলাকার নেছার আহদের ছেলে। আকাশ চৌধুরী শিবিরের চট্টগ্রাম মহানগরের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা। এর আগে তার বিরুদ্ধে নগরের মুরাদপুরে সুন্নিদের কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগ ছিল।

প্রথমে অস্বীকার, পরে বহিস্কার করলেও জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে আবারও জামায়াতে সক্রিয় হয় আকাশ চৌধুরী।

এছাড়া শাহবাগে এক নারী শিক্ষার্থীকে নিপীড়নের ঘটনায় আটক যুবককে মুক্ত করে গলায় ফুলের মালা দেওয়ার অভিযোগও উঠে।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের শুরুর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় মাজার, উপাসনালয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্থাপনায় হামলার অভিযোগ ওঠে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময় অন্তত ৯০টির বেশি ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।

জামায়াতে ইসলামীড় এতো এতো গুপ্ত সংগঠন আর রুপ রয়েছে যে, কেউ নিজ থেকে স্বিকার না কারলে, তাকে কোনভাবেই জামাতি হিসাবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। ঠিক একইভাবে জামাত দেশে ঘটিয়ে চলা নিজেদের কর্মকান্ড ও চরিত্রকে গোপন করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ও বৈদেশিক লবি-তে এক নতুন মুখোশ তুলে ধরতে ব্যাস্ত সময় পার করছে।

Visited 10 times, 1 visit(s) today