জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বাধ্যতামূলক চাঁদা পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে জাতিসংঘ খুব শিগগিরই চরম আর্থিক সংকটে পড়তে পারে, এমনকি আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই তহবিল পুরোপুরি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৯৩টি সদস্য দেশের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে গুতেরেস জানান, চলমান সংকট আগের যেকোনো আর্থিক সমস্যার চেয়ে ভিন্ন ও গভীর। তার ভাষায়, এই পরিস্থিতি কর্মসূচি বাস্তবায়নকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং পুরো ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হয় সব দেশকে সময়মতো সম্পূর্ণ চাঁদা দিতে হবে, নয়তো সংস্থার আর্থিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে—না হলে পতন অনিবার্য।
এই সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা দেশটি নিয়মিত বাজেট ও শান্তিরক্ষা তহবিলে অর্থ দেওয়া বন্ধ রেখেছে এবং একাধিক সংস্থা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব সংস্থা করদাতাদের অর্থ অপচয় করছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, আরও কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া চাঁদা পরিশোধ করছে না বা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
যদিও ২০২৫ সালের শেষ দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আর্থিক ব্যবস্থায় আংশিক সংস্কার অনুমোদন করেছিল, তাতেও সংকট কাটেনি। বরং একটি নিয়মের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে—কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হলে অব্যবহৃত অর্থ সদস্য দেশগুলোকে ফেরত দিতে হয়, এমনকি সেই অর্থ আদৌ সংগ্রহ করা না হলেও।
এর ফলে জাতিসংঘকে এমন টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে, যা বাস্তবে তাদের হাতে ছিল না। শুধু চলতি মাসেই ২০২৬ সালের হিসাবের অংশ হিসেবে ২২৭ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি।
গুতেরেস জানান, ২০২৫ সালে মোট প্রাপ্য অর্থের মাত্র ৭৭ শতাংশ পরিশোধ হয়েছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ বকেয়ার রেকর্ড তৈরি করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংগঠনের সনদ অনুযায়ী চাঁদা পরিশোধ করা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়িত্ব, এবং এই দায়িত্ব পালন না করলে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে।
জেনেভায় জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ইতোমধ্যে সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—অনেক সময় এসকেলেটর বন্ধ রাখা হচ্ছে, কমানো হয়েছে গরমের ব্যবস্থা। তবুও সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের কাজেও। মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, অর্থের অভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত থমকে যাচ্ছে, ফলে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে। আফগানিস্তানে বন্ধ হয়ে গেছে মা ও নবজাতকের জন্য পরিচালিত একাধিক ক্লিনিক। সুদানের সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের জন্য বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে রেশন কমাতে হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধু জাতিসংঘের বাজেটেই নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও সরে দাঁড়িয়েছে এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালের চাঁদা দেয়নি, যদিও আইনগতভাবে তা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো দেশও বৈদেশিক সহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা জাতিসংঘের কার্যক্রমে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে গুতেরেসের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—বর্তমান ধারা চলতে থাকলে জাতিসংঘ তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর আর্থিক অবস্থার মুখোমুখি হবে, যার পরিণতি হতে পারে সংস্থাটির কার্যকর ভূমিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
