সংবাদ প্রতিবেদন
উৎপাদন ও বিতরণ- সবই ঠিকঠাক কাগজে-কলমে। ঘাটতির চিহ্ন নেই হিসাবের খাতায়। অথচ রাজস্ব আদায়ের জায়গায় গিয়ে মিলছে না বিশাল অঙ্কের অর্থ। চট্টগ্রাম ওয়াসায় গত এক অর্থবছরেই প্রায় ৮০ কোটি টাকার পানি কার্যত ‘হাওয়া’ হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ পানির কোনো স্পষ্ট হদিস নেই খোদ সংস্থাটির কাছেই। অদ্ভুত নীরবতায় এই বড় আর্থিক ক্ষতিকে ‘সিস্টেম লস’ নাম দিয়ে দায় সারছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যয়ের কাগুজে হিসাব নিখুঁত দেখানো হলেও বিক্রি ও রাজস্ব আদায়ের খাতায় মিলছে না বিপুল অঙ্কের পানি। সবকিছু ‘স্বাভাবিক’ থাকার পরও গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম ওয়াসায় প্রায় ৮০ কোটি টাকার পানি রাজস্বের বাইরে চলে গেছে। কোথায় গেল এই পানি, কারা ব্যবহার করল—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট জবাব দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
চুরি ও অপচয়ের এই বিশাল ঘটনাকে নির্বিকারভাবে ‘সিস্টেম লস’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসেই আরও ৪০ কোটি টাকার পানি রাজস্বহীন হয়ে গেছে। তবু পরিস্থিতিকে যেন স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিচ্ছে সংস্থাটি। এমনকি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় আগেভাগেই ২০ শতাংশ ‘সিস্টেম লস’ ধরে নেওয়া হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৭২ কোটির বেশি।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতো দায় চাপাচ্ছে জনবল সংকট ও কিছু অসাধু কর্মচারীর ওপর। কিন্তু বছর ঘুরলেও একই ব্যাখ্যার ভেতরেই রয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর নির্মম বাস্তবতা।
চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের আয়-ব্যয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওয়াসায় মোট পানি উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ১৯৬ কোটি লিটার। কাগজে-কলমে এই পুরো পরিমাণ পানিই সরবরাহ করা হয়েছে। তবে বিক্রির হিসাব বলছে ভিন্ন কথা—রাজস্বের আওতায় এসেছে মাত্র ১২ হাজার ৭১৫ কোটি লিটার পানি। অর্থাৎ উৎপাদিত পানির প্রায় ২৬ শতাংশই বিক্রির খাতায় ওঠেনি।
এই রাজস্ববহির্ভূত পানির পরিমাণ ৪ হাজার ৪৭০ কোটি ৯৬ লাখ লিটার। প্রতি হাজার লিটার পানির উৎপাদন ব্যয় ১৮ টাকা ধরে হিসাব করলে হারানো পানির আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৮০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এ সময়ে ৯ হাজার ১৩১ কোটি লিটার পানি উৎপাদন ও বিতরণ করা হলেও বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৮৯১ কোটি লিটার। ফলে রাজস্বহীন পানির হার দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশ, যার পরিমাণ ২ হাজার ২৮২ কোটি ৭৫ লাখ লিটার। উৎপাদন ব্যয় অনুযায়ী এর আর্থিক মূল্য ৪০ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
বছরের পর বছর এই অপচয় বা চুরিকে যেন অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম ওয়াসায় কোটি কোটি টাকার পানি উধাও হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এর ফলে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। এই ধারাকে কার্যত স্বীকৃতি দিয়েই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগাম পরিকল্পনায়ও সিস্টেম লস ধরে বাজেট করা হয়েছে।
ওই অর্থবছরে পানি উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৭৫ কোটি লিটার। সমপরিমাণ বিতরণের বিপরীতে বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৬০ কোটি লিটার।
অর্থাৎ ২০ শতাংশ বা ৪ হাজার ১৫ কোটি লিটার পানিকে আগেভাগেই সিস্টেম লস হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৭২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এই বিপুল রাজস্ব হারানোর কারণ হিসেবে পুরনো যুক্তিই সামনে আনছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে বলেন, মিটার রিডারের সংকটই মূল সমস্যা।
তার তথ্য অনুযায়ী, ওয়াসার মোট সংযোগ ৮৬ হাজার ৩০৯টি। এর মধ্যে আবাসিক সংযোগ ৭৮ হাজার ৫৪২টি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ ৭ হাজার ৭৬৭টি। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে এত বিপুল গ্রাহকের মিটার রিডিং ও বিল বিতরণের দায়িত্বে আছেন মাত্র ৩৭ জন মিটার রিডার। প্রয়োজন যেখানে অন্তত ৯০ জন, সেখানে ঘাটতি রয়েছে ৫৩ জনের।
তার দাবি, পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে রাজস্ব ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এই চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় কৌশলে ওয়াসার পানি চুরি করে তা বিক্রি করছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে ওয়াসা নগরীতে ৩ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপন করলেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।
সুফল না মিললেও সমাধান হিসেবে আরও এক লাখ স্মার্ট মিটার স্থাপনের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতি মাসে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ৮ থেকে ১০টি অভিযান চালানো হলেও সংশ্লিষ্টদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তা এই বিশাল চুরির তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।
