বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি বয়ানে যতই “স্বাভাবিক”, “স্থিতিশীল” ও “নিয়মতান্ত্রিক” পরিস্থিতির কথা বলা হোক না কেন, বাস্তব চিত্র ক্রমেই তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে স্পষ্ট ও অস্বস্তিকর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে, যেখানে বাংলাদেশকে ঘিরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক আস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কূটনীতিতে নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা কখনোই প্রতীকী নয়। এগুলো সাধারণত রাষ্ট্রের ভেতরের পরিস্থিতি গভীরভাবে মূল্যায়নের পর নেওয়া হয়। বাংলাদেশে এমন সতর্কতা জারি হওয়া বা কূটনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার অর্থ হলো—দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আর পূর্বের মতো পূর্বানুমানযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত মনে করা হচ্ছে না। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার প্রবণতা সমস্যাকে কমায় না; বরং তা আরও ঘনীভূত করে।
নির্বাচনের প্রসঙ্গে বাংলাদেশের মূল সংকটটি এখন আর কেবল নির্বাচন হবে কি হবে না—সেটি নয়। নির্বাচন যে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে তেমন সংশয় নেই। প্রশ্ন হলো, সেই নির্বাচন কতটা অর্থবহ, প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বাসযোগ্য হবে। রাজনৈতিক মাঠে বিরোধী শক্তির কার্যকর উপস্থিতি সীমিত, প্রচারণা ও সমাবেশের ওপর নানামুখী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে ও পর্যবেক্ষক মহলে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ফলে নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে ক্ষমতা সংরক্ষণের প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এখানে “ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো অস্পষ্ট রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু স্পষ্ট মানদণ্ডের সমষ্টি। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনগণের ইচ্ছাই রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি, এবং সেই ইচ্ছা প্রকাশ পাবে নিয়মিত ও প্রকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে। এই নীতিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক রূপ দিয়েছে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) ২৫ অনুচ্ছেদ, যেখানে ভোটাধিকারকে কেবল ব্যালট দেওয়ার সুযোগ হিসেবে নয়, বরং “বাস্তব পছন্দের সুযোগ”, “ভয় ও চাপমুক্ত পরিবেশ” এবং “সমান রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা”-র সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এই মানদণ্ড অনুযায়ী নির্বাচন মূল্যায়ন করা হলে দেখা যায়, নির্বাচন শুধু ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাক্-নির্বাচনী সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলগুলোর সমান সুযোগ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং বিরোধী মতের নিরাপত্তা—সবই নির্বাচনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা জমা হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা ও ভয়ের পরিবেশ। সরকারি ভাষ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলা হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক সহিংসতার অতীত ইতিহাস, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষের স্মৃতি এবং বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষ্য একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। যখন রাজনীতি ভয়ের ভারে টিকে থাকে, তখন সেটিকে স্থিতিশীলতা বলা যায় না; বরং সেটি একটি চাপা অস্থিরতা, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে। এই ধরনের পরিবেশে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা হলো—বিদেশনীতি ও কূটনীতিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। রাজনৈতিক বক্তব্যে দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাষা, কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা উপেক্ষা এবং নিরাপত্তা প্রশ্নকে তুচ্ছ করার প্রবণতা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বাগতিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্বে সামান্য ঘাটতির ধারণাও আন্তর্জাতিক আস্থাকে দুর্বল করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো আস্থার ক্ষয়। গণতন্ত্রে আস্থা একটি কেন্দ্রীয় সম্পদ। জনগণ যখন নির্বাচনের ওপর আস্থা হারায়, তখন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমে যায় এবং রাষ্ট্র ক্রমশ বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একইভাবে আন্তর্জাতিক মহল যখন একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারায়, তখন সেই রাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই আস্থা সংকট এখনো অপরিবর্তনীয় নয়। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। নির্বাচনকে কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, বরং একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে পুনর্গঠন করা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—যেগুলো বাংলাদেশ নিজেই বিভিন্ন চুক্তি ও সনদের মাধ্যমে স্বীকার করেছে—সেগুলো বাস্তবে প্রয়োগ না করলে নির্বাচনের ফল কাগজে-কলমে বৈধ হলেও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাষ্ট্রকে দলের ঊর্ধ্বে তোলা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকার বাস্তবে কার্যকর করা এবং নির্বাচনী পরিবেশে ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙা—এসবই এখন নীতিগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নইলে সামনে যে পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে, তা কেবল একটি বিতর্কিত নির্বাচন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতার এক অধ্যায়, যেখানে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে আস্থার সম্পূর্ণ ক্ষয়।
ইতিহাস একথাই প্রমাণ করে—একবার আস্থা হারালে, তা পুনর্গঠন করা রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, কিন্তু সতর্ক সংকেতগুলো স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এখনই সেই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেবে, নাকি পরে তার মূল্য আরও বড় পরিসরে দিতে হবে।
