বিশ্লেষণ || শেখ হাসিনার ১৫ বছরে গড়ে তোলা জ্বালানি খাত যেভাবে ১৫ মাসে ধ্বংস করে দিলো ইউনূস ও জুলাইয়ের সুবিধাভোগীরা

বিশ্লেষণ || শেখ হাসিনার ১৫ বছরে গড়ে তোলা জ্বালানি খাত যেভাবে ১৫ মাসে ধ্বংস করে দিলো ইউনূস ও জুলাইয়ের সুবিধাভোগীরা
শেয়ার করুন

ড. মামুনুর রশীদ

কম দামে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা বিনিয়োগের পূর্বশর্ত। শেখ হাসিনার সময়কালে বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছিলো। গৃহস্থালির প্রয়োজন বাড়ার সাথে শিল্প খাতের প্রয়োজন মেটানোর জন্য কুইক রেন্টাল, দেশীয় উৎপাদন, এবং জ্বালানি আমদানি করা হয়েছিলো। যার ফল খুব পরিষ্কার – দেশের রপ্তানি বেড়েছে কয়েকগুণ এবং দেশীয় উৎপাদন (জিডিপি) ১০২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার।

শেখ হাসিনার সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে মোটাদাগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়:

  • বৃহৎ পরিসরে জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ
  • জ্বালানি শক্তির উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা এবং
  • জ্বালানি সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ

মোটামুটি দেশীয় শক্তি ব্যবহার করে ৪,৯০০ মেগাওয়াটের “সক্ষমতাকে” ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি করেছেন শেখ হাসিনা। কিন্তু আজকে বাংলাদেশের জ্বালানি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। উৎপাদনকারীরাও উদ্বিগ্ন।

জ্বালানির অভাবে সাধারণ মানুষকে ২০ বছর আগে ফেলে দেয়া মাটির চুলায় ফিরে যেতে হয়েছে। তাহলে কি জাদুতে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জ্বালানি সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন? আসুন কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখি।

তথ্যগুলো ইন্টারনেট থেকে নিম্নবর্ণিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন দেখে তৈরি করা। যেকোনো ভুল, বিভ্রান্তি, এবং অসম্পূর্ণতা লেখকের নিজের। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান রইল।

  • বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বার্ষিক প্রতিবেদন
  • বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন
  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়
  • বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদন
  • আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা
  • বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো
  • বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন

জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর দেশীয় উৎপাদনের প্রয়োজনে জ্বালানি প্রবৃদ্ধির উপর নজর দেন শেখ হাসিনা। ২০০৯ সালের “উৎপাদন সক্ষমতাকে” ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৪৪০% বৃদ্ধি করেন। একই সময়ে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি করেন প্রায় ২.৫ গুণ।

২০০৯ সালের আগে সারাদেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ (৫৩%) বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রক্রিয়ার বাহিরে ছিলো। ২০২৩-২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকার ১০০% মানুষের জন্য সার্বজনীন বিদ্যুত সঞ্চালন ব্যবস্থা করেন।

যখন চারদিক থেকে কুইক রেন্টাল কিংবা “নিজেদের গ্যাস ব্যবহার না করে ভারত থেকে কেনো আমদানি করা” নিয়ে অপপ্রচার শুরু হয়, শেখ হাসিনা দেশের গ্যাসের উপর প্রভাব কমানোর চেষ্টায় জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেন। যার কারণে, ২০০৮-২০০৯ সালের তেল-গ্যাসের উপর যেখানে প্রভাব ছিলো প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি, ২০২৩-২৪ এ এসে তা কমে দাঁড়ায় ৫০% এ। আর এই ব্যবধান মেটানোর জন্য কয়লা-ভিত্তিক, সৌর, এবং পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে তোলেন একেরপর এক মেগা প্রকল্প।

কয়লা ভিত্তিক উৎপাদনে, ২০০৯ সালের অতি নগণ্য অবস্থা থেকে ২০২০ সালে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রথমে ৬৬০ মেগাওয়াট হয়ে মোট ১৩২০ মেগাওয়াটের সক্ষমতা যুক্ত হয়।

দেশের প্রয়োজনে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে সরকার। ২০১৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পর, ২০২২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পুরোদমে সম্ভব না হলেও, তার পরের বছর ২০২৩ সাল থেকে ১৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ আসতে শুরু করে। কিছু বিদ্যুৎ নেপাল থেকেও আসে।

নবায়নযোগ্য শক্তির কথা মাথায় রেখে সৌরবিদ্যুতের প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০২৩ সাল নগদ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও, প্রায় ৩% এর মতো জ্বালানি সংস্থানের ব্যবস্থা হয়। এর পাশাপাশি দৈনিক প্রায় ১০০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট এলএনজি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পিছনে শেখ হাসিনা সরকারের তিনটি উদ্দেশ্য ছিলো বলে আমি মনে করি: ১) সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, ২) জ্বালানি উৎসের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং ৩) নিজেদের খনিজ সম্পদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ করা।

উপরের সিদ্ধান্তগুলোর থেকে যেমন অনেক অগ্রগতি দেখতে পেয়েছি, তেমনি জুলাইয়ের সন্ত্রাসী হামালার পর দেখছি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন শেখ হাসিনা। জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণে একদিকে যেমন বিতরণ ক্ষতি কমেছে (১৪% থেকে কমে ৮% এ নেমেছে), একইভাবে কিছু গোষ্ঠী তাদের কাছ থেকে দুই-গুণ বেশি দামে জ্বালানি কেনার জন্য রেজিম চেঞ্জ পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে। আজ এই জ্বালানি নিরাপত্তা এমন এক সংবেদনশীল ব্যপারে পরিণত হয়েছে যে দৈনিক পত্রিকাগুলো এই ব্যপারে সত্য ছাপতে ভয় পায়।

নতুন জ্বালানির সরবরাহে বিনিয়োগ

জ্বালানি নিরাপত্তায় শেখ হাসিনা সরকারের বিনিয়োগকে চারটি খাতে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

১) বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প

  • কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ক. পায়রা ১,৩২০ মেগাওয়াট, খ. রামপাল ১,৩২০ মেগাওয়াট, গ. মাতারবাড়ি ১,২০০ মেগাওয়াট
  • এলএনজি-থেকে-বিদ্যুৎ: এফএসআরইউ-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (যেমন: সামিট এলএনজি, এক্সেলেরেট এনার্জি): আমদানিকৃত এলএনজি ব্যবহার করে দ্রুত ক্ষমতা সংযোজন (কুইক রেন্টাল)। ফ্লোটিং স্টোরেজ ব্যবহার করা হয়েছে এই উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ প্রক্রিয়ায়
  • বৃহৎ সিসিজিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র: কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস টারবাইন প্ল্যান্ট (যেমন: বিবিয়ানা – ৩, মেঘনাঘাট, হরিপুর): সক্ষমতা উন্নয়ন
  • আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ আমদানি: ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃসংযোগ: ভারত থেকে (ত্রিপুরা-বাংলাদেশ, ভেরামারা-বহরমপুর)
  • পরমাণু বিদ্যুৎ: রূপপুর ২,৪০০ মেগাওয়াট: ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

২) গ্যাস অবকাঠামো

  • এলএনজি টার্মিনাল: ক. এফএসআরইউ-১ (মহেশখালী, ২০১৮) – ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট/দৈনিক ক্ষমতা, খ. এফএসআরইউ-২ (মহেশখালী, ২০২০) – এলএনজি আমদানির ক্ষমতা দ্বিগুণ
  • গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণ: এলএনজি পরিবহনের জন্য নতুন পাইপলাইন স্থাপন (যেমন: ভোলা–ঢাকা, পায়রা–ঢাকা)

৩) সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ

  • জাতীয় গ্রিড শক্তিশালীকরণ: ৪০০ কেভি এবং ২৩০ কেভি লাইন আপগ্রেড; নতুন সাবস্টেশন চালু
  • ডিজিটাল মিটারিং ও প্রিপেইড সিস্টেম
  • বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ: পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে লাইন সম্প্রসারিত করা হয়েছে

৪) নবায়নযোগ্য শক্তি বিনিয়োগ

  • সোলার পার্ক: টেকনাফ ৫ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহ ৭৩ মেগাওয়াট ইত্যাদি
  • সোলার হোম সিস্টেম (সাময়িক; গ্রিড সম্প্রসারণের পরে যদিও পরে বন্ধ হয়ে যায়)
  • প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর বিদ্যুৎ কর্মসূচি (শিল্প এলাকায় চলমান)
  • বায়ুচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প: কক্সবাজারে প্রথম ধাপ (৬০ মেগাওয়াট) ২০২৩ সালে চালু

কী ছিলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?

২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এরপর দেখা দেয় ডলার সংকট। তারপরও সরকার চেষ্টা করেছে তার পরিকল্পনা ঠিক রেখে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (যেমন: মিরসরাই, আনোয়ারা) নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা ছিলো। শিল্প প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি দেয়া হয়। যদিও এখনও তা জাতীয় গ্রিডের ব্যাকআপের উপর নির্ভর করে।

জ্বালানি খাতে আর্থিক ব্যয় মেটানোর জন্য বিপিডিবি, ইজিসিবি, এবং পেট্রোবাংলার ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থা ছিলো। আইপিপি এবং পিপিপি পদ্ধতির ব্যবহার করে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হয়েছিল। দেশীয় উৎপাদনের প্রায় ৫০% বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এসেছে। সরকারের সক্ষমতার কারণে বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা এবং দেশ অর্থায়ন করতে এগিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে আছে জাইকা, এডিবি, বিশ্বব্যাংক, চীন, এবং রাশিয়া।

ইউনূস কীভাবে ধ্বংস করেছে জ্বালানি খাত?

আগস্ট ২০২৪ সালের সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষমতা দখল করার পর ইউনূস বিভিন্ন গোষ্ঠীকে খুশি করতে জ্বালানি খাতকে ব্যবহার করেছে। জ্বালানি খাতে ইউনূসের নেয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে গেছে। নিচে কিছু মাধ্যম বর্ণিত হলো:

  • দ্বিগুণ দামে এলএনজি আমদানি
  • ভারতের সাথে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি বাতিল না করে বরং ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে
  • রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ এবং বিনিয়োগে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ
  • রহস্যজনকভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আসা কাঁচামাল বিমানবন্দরে আগুনে পুড়ে যাওয়া
  • মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া
  • কৃত্তিম জ্বালানি সংকট তৈরি করে প্রতিদিন ত্রিশ হাজার কোটি টাকার মতো লুট করা
  • সঞ্চালন লাইন থেকে জ্বালানি তেল গায়েব করে দেয়া

এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার ফল হচ্ছে লোডশেডিং, অপচয়, অবচয়, এবং সীমাহীন দুর্নীতি। একেরপর এক দেশবিরোধী সিদ্ধান্তে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। শেখ হাসিনার কষ্ট করে তৈরি দেশের সুপরিকল্পিত জ্বালানি খাত আজ ধ্বংসের মুখে। ইউনূস এবং জুলাই এর দেশবিরোধী শক্তি দেশকে আবারও অন্ধকারের পথে ঠেলে দিলো।

লেখক পরিচিতি: অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Visited 36 times, 1 visit(s) today