সহায়তা কমায় শতাব্দীর প্রথমবার বাড়তে পারে শিশুমৃত্যু, হুঁশিয়ারি গেটস ফাউন্ডেশনের

সহায়তা কমায় শতাব্দীর প্রথমবার বাড়তে পারে শিশুমৃত্যু, হুঁশিয়ারি গেটস ফাউন্ডেশনের
শেয়ার করুন

বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর সংখ্যা চলতি শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে গেটস ফাউন্ডেশন। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে বলে সংস্থাটির নতুন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গেটস ফাউন্ডেশনের ‘গোলকিপারস’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৪৮ লাখ শিশু পাঁচ বছর বয়সের আগেই মারা যেতে পারে। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় দুই লাখ বেশি মৃত্যু, যেগুলোর বেশিরভাগই প্রতিরোধযোগ্য। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতি বছর শিশুমৃত্যু ধারাবাহিকভাবে কমলেও এই প্রথম সেই প্রবণতা ভাঙতে চলেছে।

গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মার্ক সুজম্যান বলেছেন, এই মৃত্যু সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব। তাঁর মতে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও নিয়মিত টিকাদানের মতো কার্যকর উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে এসব শিশুর প্রাণ বাঁচানো যেত।

তিনি সরকার ও বেসরকারি দাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, জীবনরক্ষাকারী খাতে আবারও অগ্রাধিকার দিতে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা কমে গেছে ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ একাধিক ধনী দেশ উন্নয়ন সহায়তা কমিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর। এসব দেশ ইতোমধ্যেই ঋণের চাপ ও দুর্বল অবকাঠামোর মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমানোর প্রভাব বড় বলে উল্লেখ করেছে গেটস ফাউন্ডেশন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় দাতা ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি আগামী বছরগুলোতে স্বাস্থ্য সহায়তা ২০ শতাংশ কমে থাকে, তাহলে ২০৪৫ সালের মধ্যে অতিরিক্ত এক কোটি ২০ লাখ শিশুর মৃত্যু হতে পারে। আর এই কাটছাঁট ৩০ শতাংশে পৌঁছালে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে এক কোটি ৬০ লাখে।

প্রতিবেদনটি জোর দিয়ে বলেছে, সীমিত সম্পদেও সবচেয়ে বেশি প্রাণ বাঁচানোর উপায় হলো শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। বছরে জনপ্রতি ১০০ ডলারের কম ব্যয়ে উন্নত প্রাথমিক সেবার মাধ্যমে প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

পাশাপাশি টিকাদানকে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, টিকায় বিনিয়োগ করা প্রতি ডলার অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গড়ে ৫৪ ডলারের সমপরিমাণ সুফল এনে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, টিকা শুধু প্রাণই বাঁচায় না, বরং বড় আকারের রোগপ্রাদুর্ভাব ঠেকিয়ে হাসপাতাল ও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায়। হাম, মেনিনজাইটিস ও অন্যান্য রোগে ২০২৩ সালেই বিশ্বে এক লাখের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে এইচআইভি, নিউমোনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধে নতুন প্রজন্মের টিকা ও চিকিৎসা উদ্ভাবনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাভি ও গ্লোবাল ফান্ডের মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অর্থায়ন বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

গ্যাভি ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় ১২ কোটি শিশুকে টিকা দিয়ে দুই কোটির বেশি মৃত্যু ঠেকিয়েছে বলে জানানো হয়।

গেটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বিল গেটস এই সময়কে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর মতে, সঠিক সিদ্ধান্ত ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করা গেলে বহু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু এখনও ঠেকানো সম্ভব। অন্যথায়, ইতিহাস মনে রাখবে এমন একটি প্রজন্ম হিসেবে, যারা বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শিশুদের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়েছে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today