নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একদিকে আইনি নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে একের পর এক হত্যা, হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর থেকে তাদের কয়েক হাজার নেতাকর্মী এবং স্বজনরা পরিকল্পিতভাবে হামলা, হত্যাকাণ্ড ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে ছাত্রলীগকে “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত” উল্লেখ করে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করেছে বলে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও দেশি–বিদেশি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও ২০২৪ সালের সেনা সমর্থিত দাঙ্গায় ক্ষমতা দখলে নেওয়া ড. ইউনূসের শাসনামলেরই সাংবিধানিক কোন ভিত্তি নেই।
‘নিষিদ্ধ’ ছাত্রলীগ: কোন আইনে, কী যুক্তিতে
সরকারি প্রজ্ঞাপন ও সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ২৩শে অক্টোবর সন্ত্রাসবাদ দমন আইন-২০০৯ এর আওতায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, ক্যাম্পাসে সহিংসতা, হলে নির্যাতন, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ছাত্রলীগ এই নিষেধাজ্ঞাকে সংবিধানবহির্ভূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
সহিংসতার ধারাবাহিকতা: ক্যাম্পাস থেকে গ্রাম
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশজুড়ে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে—এ নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট বা সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের একাধিক হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা সামনে আসে।
দেশের প্রধান তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন হত্যাকাণ্ড
১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৪ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মারধরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে পুলিশ ও সংবাদমাধ্যম জানায়।
৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়ার পর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
১৮–১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে মারধরের ঘটনায় সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, ঘটনাটি তদন্তাধীন।
পরিবার ও স্বজনদের ওপর হামলা: গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত সহিংসতা
ক্যাম্পাসের বাইরেও সহিংসতার ঘটনাগুলো গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
পঞ্চগড়: ৬ই ডিসেম্বর ২০২৪ দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ছাত্রলীগ নেতার মা নিজ বাড়িতে নামাজরত অবস্থায় পেছন থেকে আঘাতে নিহত হন।
মৌলভীবাজার: গভীর রাতে ঘরে ঢুকে এক ছাত্রলীগ নেতার বাবা ও চাচাকে কুপিয়ে হত্যার খবর জানা যায়। ২৭শে ডিসেম্বর, শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের বিওসি কেছরিগুল গ্রামে ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন এলাকার বাড়িতে হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ স্থানীয় লোকজন বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও পূর্ববিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
নিহতরা হলেন—বিওসি কেছরিগুল গ্রামের মৃত নিমার আলীর বড় ছেলে কুয়েতপ্রবাসী জামাল উদ্দিন (৫৫) এবং তার ছোট ভাই কৃষক আব্দুল কাইয়ুম (৪৮)। নিহত জামাল উদ্দিন মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাবেক উপ-প্রচার সম্পাদক মেহেদী হাসান কবিরের বাবা। তিনি মাত্র ছয় মাস আগে কুয়েত থেকে দেশে ফিরেছিলেন।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন একই গ্রামের মৃত আব্দুস সবুরের ছেলে মো. জমির উদ্দিন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা শেখ রুমেল আহমদের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে তাঁর মা ও চাচির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার রাত আড়াইটার দিকে উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামে বসতবাড়ির ডুপ্লেক্স ভবনে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
ফেনীর সোনাগাজী: দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানায়, অসুস্থ মাকে দেখতে আসা এক ছাত্রলীগ নেতার পায়ের রগ কেটে জখম করা হয়। ওই ছাত্রলীগ নেতার নাম দ্বীন মোহাম্মদ ফিরোজ। তিনি ছাত্রলীগের মজলিশপুর ইউনিয়ন শাখার সহসভাপতি এবং রাঘবপুর গ্রামের সাহাব উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার আগে ১০ থেকে ১২ জনের একদল লোক ফিরোজকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় তারা ফিরোজকে একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা নির্যাতন চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে তাকে আহত অবস্থায় রেখে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে পুলিশ তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়।
ফিরোজের মা সুলতানা আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই মিজানুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিএনপি নেতা আবুল হোসেন লিটনের বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধ চলছে। দু’মাস আগে লিটন জামিনে মুক্তি পেয়ে আমার ছেলেকে কয়েক দফা হামলার চেষ্টা করেন। তাদের ভয়ে আমার ছেলে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করে। আমার অসুস্থতার খবর পেয়ে ছেলে কয়েক দিন আগে গোপনে বাড়িতে আসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাড়ি আসার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে লিটন তার দলবল নিয়ে আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে যায় এবং তিন ঘণ্টা আটক রেখে ড্রিল মেশিন দিয়ে আঘাত করে পায়ের রগ কেটে দেয়। এ ছাড়া তাকে পিটিয়ে জখম করে। ছেলেকে উদ্ধার করতে গেলে তারা আমার বোন মোমেনা আক্তার ও কাউসার নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে আহত করে। আমি তাদের হাতে-পায়ে ধরে মিনতি করেও ছেলেকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে পারিনি।’
মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শেখ রুমেল আহমদের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে তাঁর মা ও চাচির মৃত্যু হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরে বিএনপি কর্মীরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়
অগ্নিকাণ্ডে শেখ রুমেল আহমদের মা মেহেরুন্নেছা (৬৫) ও চাচি ফুলেছা বেগম ওরফে কটি বিবি (৬০) মারা গেছেন। ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
‘জয় বাংলা’ লেখায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘জয় বাংলা’ লেখায় ২ ছাত্রলীগ কর্মীকে হত্যা করা হয়। জানা যায়, দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ লেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই কর্মী নিহত হন।
এই ধারাবাহিক সহিংসতার মধ্যেই ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আইনের শাসন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সহিংসতা দমনের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ। আর ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ দাবি করছে, এটি একটি টার্গেটেড দমন–নীতি, যার ফলে নেতাকর্মী ও তাঁদের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে।
একের পর এক ঘটনায় ছাত্রলীগ–যুবলীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উঠে আসায় সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
