বিশেষ প্রতিবেদক
শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর ঘটনা আর একটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য, গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ের তৎপরতা বিশ্লেষণে উঠে আসছে হাদীর লাশকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক-উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার ছক বাস্তবায়নে নেমেছে। এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছে এনসিপি ও শিবিরঘেঁষা একাধিক নেতা, যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশনায় বৃহস্পতিবার রাতেই ঢাকা শহর কার্যত নাশকতার মাঠে পরিণত হয়।
এছাড়াও এই অস্থিররতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠনের পাঁয়তারা করছে একাধিক পক্ষে, যাদের ইউনূস সরকারের উপর থেকে আস্থা উঠে গেছে।
বৃহস্পতিবার হাদীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয় পরিকল্পিত তাণ্ডব। দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়ি এবং ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে একযোগে হামলার ঘটনা- সবকিছুই ঘটে একই সময় । শুধু ঢাকা নয়—চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একযোগে হামলার খবর পাওয়া যায়।
গোয়েন্দাসূত্র বলছে, এসব ঘটনাগুলো সমন্বিত ও পরিকল্পিত। এছাড়া, নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিমালটেনিয়াস অ্যাটাক স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে না। এটি স্পষ্টভাবে ট্রিগার-ভিত্তিক অপারেশন।
এদিকে, সহিংসতার আগের কয়েক ঘণ্টায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক উস্কানিমূলক পোস্ট গোয়েন্দা নজরদারিতে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শিবির নেতা সাদিক কায়েম এবং এনসিপি সংশ্লিষ্ট নাহিদ, সারজিস, হাসনাতের পাশাপাশি আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও মাহফুজ আলম—এই নামগুলো ধারাবাহিকভাবে নজরে আসে।
পোস্টগুলোতে সরাসরি হামলার নির্দেশ না থাকলেও—‘রাজপথ দখলের সময়’; ‘প্রতিশোধ আসছে’; ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’ এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়, যা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জন্য কোডেড নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
একইসাথে দেখা গেছে, বিদেশে অবস্থানরত উগ্রবাদী ইউটিউবার ইলিয়াস তার পোস্ট থেকে সরাসরি হামলায় উস্কানি দিয়েছে ক্রমাগত। দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারকে ভারতের সহযোগী উল্লেখ করে সেখানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু ফেসবুক পোস্ট থেকে নয়, ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ইলিয়াসসহ উগ্রবাদীরা উস্কানি দিয়ে গেছে। এরমধ্যে ভাইরাল ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে উস্কানি দিতে দেখা গেছে ইলিয়াসকে।
সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলার পাশাপাশি চট্টগ্রাম এবং খুলনায় ভারতীয় দূতাবাসের পাশাপাশি দূতাবাসে কর্মরতদের বাসভবনেও উগ্রবাদীরা হামলা চালিয়েছে।
এসব ঘটনা গতরাতে যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়, তখন দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন—এগুলো ‘বিচ্ছিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠীর’ কাজ, দলীয় সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই বক্তব্যে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
একাধিক অডিও ও বার্তালাপ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অনেক কর্মীই অভিযোগ করছেন—“ব্যবহার করে এখন দায় এড়ানো হচ্ছে।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে শনিবার হাদীর জানাজা ঘিরে। গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শিবির নেতাদের নেতৃত্বে সারাদেশ থেকে ঢাকায় লোক জড়ো করার পরিকল্পনা চলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুই জানাজা নয়, এটি হতে পারে একটি মোবিলাইজেশন পয়েন্ট।
তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার মূল ধাপগুলো হলো—জানাজার নামে বিপুল জনসমাগম, আবেগ ও ক্ষোভকে রাজনৈতিক স্লোগানে রূপান্তর। সেখান থেকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে রাজধানীর স্পর্শকাতর এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এবং বিদেশি দূতাবাস, সরকারি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার চেষ্টা
একাধিক সূত্র এটিকে ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনের নামে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নবাজ ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মরদেহকে কেন্দ্র করে জনতাকে ব্যবহার করার এই কৌশল নতুন নয়, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছি।
তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থের যোগান, পরিবহন ব্যবস্থা ও সম্ভাব্য টার্গেট সবকিছুই নজরদারিতে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাদীর লাশকে কেন্দ্র করে যে রাজনীতি হচ্ছে, তা কেবল একটি দলের সংকট নয়, এটি উগ্রবাদী রাজনীতির পুনরুত্থানের ইঙ্গিত।
একজন বিশ্লেষক বলেন, শোককে হাতিয়ার করে রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলার চেষ্টা হলে সেটি আর রাজনীতি থাকে না, তা সরাসরি সন্ত্রাস।


