নিজস্ব প্রতিবেদক
সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীকে বাঁচাতে জরুরি অ্যান্টিভেনম (ভ্যাক্সিন- সাপের বিষের প্রতিষেধক) প্রয়োজন হলেও গত দেড় বছর ধরে কেনা হয়নি এই প্রাণরক্ষাকারী প্রতিষেধক। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে প্রচন্ড অ্যান্টিভেনম সংকট চলছে, ফলে হাসপাতালে এসেও চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে রোগী।
সম্প্রতি সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৬ বছরের শিখা মনিকে বাঁচাতে স্বজনরা সাভার থেকে শুরু করে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেও শেষ পর্যন্ত অ্যান্টিভেনম না পাওয়ায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার। এ ঘটনার পরে আবারও আলোচনায় আসে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম সংকট।
এ বিষয়ে গত দুদিন ধরে বিডি ডাইজেস্ট-এর সাথে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বিডি ডাইজেস্টকে জানান, যথেষ্ট পরিমাণ মেডিসিনের সংকট থাকলেও নতুন করে কেনা হচ্ছে না অ্যান্টিভেনম (ভ্যাক্সিন)। বরং হাসপাতালগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বাজার থেকে অ্যান্টিভেনম (ভ্যাক্সিন) কিনে জরুরী পরিস্থিতি মোকাবিলার।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র হলেও এখানেও নেই অ্যান্টিভেনম (ভ্যাক্সিন)। হাসপাতালটির একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম (ভ্যাক্সিন) শেষ হয়ে গেছে ৪ মাস আগে। গত একবছরে নতুন কোন এন্টিভেনম দেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেশের দুর্যোগপ্রবণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও অ্যান্টিভেনম (ভ্যাক্সিন) দেওয়া শুরু হয়। তারপর থেকে সাপের কামড়ে কাটা রোগীর মৃত্যুর হার কমে আসে।
যা হয়েছিল শিখা মণির সাথে
সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৬ বছরের শিখা মনিকে বাঁচাতে স্বজনরা একের পর এক হাসপাতালে ছুটেছেন। কিন্তু কোথাও মেলেনি জরুরি অ্যান্টিভেনম (ভ্যাক্সিন)। সাভার থেকে শুরু করে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেও শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। অবশেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর পর মৃত্যু হয় শিশুটির।
গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ির পাশে থেকে শিশু শিখা মনি সাপের কামড়ের শিকার হয়। পরে রাত ৮টার দিকে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। স্বজনদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে ভ্যাক্সিন ও সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায় শিশুটি।
শিখা মনি সাভারের ব্যাংক টাউনের নামা গেন্ডা বটতলা এলাকায় জহুরুল ইসলামের মেয়ে। তার বাবা দুবাই প্রবাসী এবং মা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিহত শিশুর নানি শাহনাজ বেগম বলেন, আমার প্রতিবন্ধী মেয়ে জেসমিন আক্তারের একমাত্র আদরের সন্তান ছিল শিখা মনি। দুপুরের দিকে অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে বাড়ির পাশে খেলতে গিয়েছিল। সেখানে তার বাম পায়ে একটি সাপ কামড় দেয়। প্রথমে তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। চিকিৎসক একটি ওষুধ দিয়ে বলেন—এটা দুই বেলা খাওয়ালে ঠিক হয়ে যাবে। পরে আমরা তাকে বাসায় নিয়ে আসি। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে সাভারের এনাম মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসক জানান—দ্রুত শিশুটিকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিতে হবে।
যানজটের মাঝে আমরা তাকে সোহরাওয়ার্দীতে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জানান—তাদের কাছে সাপের বিষের ভ্যাক্সিন নেই, দ্রুত মহাখালীতে নিতে হবে। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে মহাখালী হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও জানানো হয় ভ্যাক্সিন নেই। সারাদিন কষ্ট করে শেষে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এলে চিকিৎসক বলেন—শিখা আর বেঁচে নেই। এত বড় দেশে সাপের কামড়ে ভ্যাক্সিন না থাকলে আমরা কী করব! এখন তার বাবাকে কী বলব? তার মা নিজেও প্রতিবন্ধী—শুধু তাকিয়ে থাকে আর কান্না করে—এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক চিকিৎসকের বরাত দিয়ে শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে।
