জীবিত ভাইকে ‘জুলাই শহীদ’ বানিয়ে মিথ্যা মামলা: আসামি শেখ হাসিনাসহ ৪২ নেতাকর্মী!

জীবিত ভাইকে ‘জুলাই শহীদ’ বানিয়ে মিথ্যা মামলা: আসামি শেখ হাসিনাসহ ৪২ নেতাকর্মী!
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

ভাইকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধের জেরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের উত্তাল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাইকে ‘জুলাই শহীদ’ সাজিয়ে মামলা করেন মোস্তফা কামাল ওরফে মোস্ত ডাকাত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ষড়যন্ত্রই উল্টো তার গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের এই মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্তে পুলিশ দেখতে পায়—৩রা আগস্ট যাকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল, সেই দুলাল ওরফে সেলিম (প্রকৃত নাম: সোলায়মান সেলিম) এখনও জীবিত।

এ ঘটনার প্রেক্ষিতে বাদী মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা করার অভিযোগ আনার অনুমতি চেয়েছেন ঢাকার ডিবি ওয়ারী বিভাগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইনামুল ইসলাম।

ডিবির ওয়ারী জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন বলেন, “ইচ্ছাকৃতভাবে বাদী মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করতে আদালতের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আদালত যে নির্দেশনা দেবেন, সে অনুযায়ী আমরা কাজ করব।”

মামলার আবেদনে মোস্তফা কামাল তার ভাই সোলায়মান সেলিমের নাম দেন ‘দুলাল ওরফে সেলিম’। পেশা দেখানো হয় ঠিকানা পরিবহনের হেলপার। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ৩রা আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নিহত হয়েছেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে যাত্রাবাড়ী থানাকে এজাহার হিসেবে মামলা রুজুর নির্দেশ দেয়।

প্রথমে এ মামলায় ৪১ জনকে আসামি করা হয়। পরে পুলিশ আরও একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখালে সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২—যার মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তারও দেখানো হয়।

কিন্তু পরবর্তী তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে, সেলিম মোটেও নিহত হননি। এলাকায় ডাকাত হিসেবে পরিচিত, হত্যা-ডাকাতিসহ একাধিক মামলার আসামি ও পলাতক থাকা মোস্তফা কামাল পারিবারিক বিরোধে ভাইকে ফাঁসাতেই তাকে জুলাই শহীদ সাজিয়ে এই ভুয়া মামলা করেন।

সোলায়মান সেলিম অভিযোগ করেন, “আমার কোনো ছেলে নেই। আমাকে মেরে জমি দখল করতে চায়। তাই আমাকে মৃত দেখিয়ে মামলা করেছে, যেন পরে সত্যিই আমাকে হত্যা করা সহজ হয়। এখনও আতঙ্কে থাকি—কখন কী করে ফেলে!”

দুই মেয়ের জনক সেলিম স্ত্রীকে নিয়ে বর্তমানে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বেলতলী বাজারে থাকেন। তিনি বলেন, “ভাইদের ভয়ে বাড়িতে পর্যন্ত যেতে পারি না। দোকানেই থাকি। শুধু আমাকে নয়, আমার মেয়েদেরও হত্যার হুমকি দেয়; এতে তারা আমার জমি নিতে পারবে।”

মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশের হাতে থাকলেও পরে তদন্তভার ডিবিতে যায়। তদন্ত শেষে ৩০শে নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন এসআই ইনামুল, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন জানান, “এ মামলার পরবর্তী শুনানি ২১শে ডিসেম্বর। সেদিন চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হবে।”

শেখ হাসিনার পাশাপাশি যাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে তারা হলেন— আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, রমেশ চন্দ্র সেন, আসাদুজ্জামান নুর, সাংসদ শামীম ওসমান, মশিউর রহমান মোল্লা সজল, অয়ন ওসমান, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ সভাপতি রাজিবুল ইসলাম বাপ্পি ও সাধারণ সম্পাদক সজল কুণ্ড।

এ ছাড়া গ্রেপ্তার দেখানো দুই আসামি—মোহাম্মদ উল্লাহ পাটোয়ারী ও মিরাজ খানকেও অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্তে নেমে এসআই ইনামুল দেখতে পান, বাদী মোস্তফা কামাল এবং যাকে নিহত দেখানো হয়েছে সেই সেলিম আসলে আপন দুই ভাই। তারা মোট চার ভাই ও দুই বোন। ভাইদের মধ্যে সেলিম (৫০) সবচেয়ে ছোট। বড় ভাই হেলাল উদ্দিন (৬২), মেজ ভাই মো. আবুল হোসেন আলম (৫৮) এবং সেজো ভাই মোস্তফা কামাল (৫৫)। মোস্তফা ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকায় এলাকায় ‘মোস্ত ডাকাত’ নামেই পরিচিত।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোস্তফার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া থানায় হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সার্চ ওয়ারেন্টও আছে, যার কারণে তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে পলাতক। এই দীর্ঘ সময়ে তার সঙ্গে সেলিমের কোনো যোগাযোগও ছিল না। ভাইদের সঙ্গে সেলিমের জায়গা-জমি নিয়ে চলমান বিরোধও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

হত্যাকাণ্ড সাজানোর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, “আপন ছোট ভাই সোলায়মান সেলিমকে পরবর্তীতে হত্যা করে লাশ গুম করে সম্পত্তি দখল এবং অসাধুভাবে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশায় মোস্তফা কামাল টাকার বিনিময়ে এজাহারনামীয় আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।”

তদন্ত শেষে এসআই ইনামুল জানান, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে দেখা গেছে, যাকে ‘নিহত’ বলা হয়েছিল তিনি জীবিত আছেন। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের সুযোগ নিতে বৈছা পরিবেশকে ব্যবহার করা হয়েছে, এবং সেই কারণে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার দেখানো দুই আসামির একজন মিরাজ খানের আইনজীবী রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, “লোকটা (মক্কেল) রাজনীতি করেন না। তবুও তাকে আসামি করা হয়েছে। তাকে প্রথমে লালবাগ থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আরও কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যার মধ্যে যাত্রাবাড়ীর মামলাটাও আছে। হত্যার ঘটনাই ঘটেনি—তবুও তিনি আসামি হলেন, হয়রানির শিকার হলেন। তার উচিত হবে রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা। কারণ বিনা কারণে তাকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।”

মামলার বাদী মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Visited 61 times, 1 visit(s) today