ব্যাংকিং খাত সংস্কারের নমুনা: দেশের খেলাপি ঋণের হার বিশ্বে এখন সর্বোচ্চ!

ব্যাংকিং খাত সংস্কারের নমুনা: দেশের খেলাপি ঋণের হার বিশ্বে এখন সর্বোচ্চ!
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

চার বছর ধরে যুদ্ধের মধ্যে থাকা ইউক্রেনের ব্যাংকিং খাতও বর্তমান বাংলাদেশের চেয়ে এতটা দুর্বল নয়। ইউক্রেনে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ২৬ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে প্রদত্ত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ এখন খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

আন্দোলন-সহিংসতার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ঘটাতে সৃষ্ট দাঙ্গা-সহিংসতাকে বৈধতা দিতে ব্যাংকিং খাতে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালানো দেওয়া হয়েছিল। সহিংসতাকারীদের ঘাড়ে চেপে ক্ষমতা দখল করা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও আশার ফুলঝুরি ছড়িয়ে বলেছিল, দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো হবে, ব্যাংকিং খাতকে সংস্কারের মাধ্যমে স্থিতিশীল করা হবে, ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে অর্থনীতির ভিত শক্ত করা হবে… ইত্যাদি।

অথচ দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্কারের কোনো সুফল তো মেলেনি, উল্টো পেছনে যাত্রা শুরু করেছে অর্থনীতি। শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে একে একে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের চালু ব্যবসা ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশজ উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, কর ব্যবস্থাপনাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব পড়েছে এসব কারণে। ফলে খেলাপি ঋণও বেড়েছে সমান গতিতে।

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও খ্যাতনামা গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে সবচেয়ে খারাপ। এমনকি কোনো দেশেই খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়ায়নি। সাম্প্রতিক যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশগুলোর খেলাপি ঋণের হারও বাংলাদেশের তুলনায় বহু কম।

আরব বসন্তের সূত্রপাতকারী এবং এখনো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতায় থাকা তিউনিসিয়ার খেলাপি ঋণের হার ১৪.৭ শতাংশ। লেবাননের হার ২৪ শতাংশের নিচে। রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও খেলাপি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে—হার মাত্র ৫.৫১ শতাংশ। অথচ দেশটির ব্যাংকিং খাতে অতীতে অলিগার্কদের প্রভাবের কারণে খেলাপি ঋণ বরাবরই বেশি দেখা গেছে।

বিনিময় হার অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপসহ নানা সংকটে থাকা এশিয়া, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশিরভাগ দেশে খেলাপি ঋণের হার এখন কমছে। যেমন তুরস্কের ব্যাংকিং খাতে চলতি সেপ্টেম্বরের খেলাপি ঋণ ২.২৯ শতাংশে নেমে এসেছে। কয়েক বছর আগে দেউলিয়া হওয়া গ্রিস এখন খেলাপি ঋণের হার ৩.৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এমনকি আর্জেন্টিনায়ও এখন এই হার মাত্র ১.৬ শতাংশ, যেখানে সহস্রাব্দের শুরুতে দেশটিতে ২০ শতাংশের বেশি ঋণ ছিল খেলাপি অবস্থায়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। এই অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ বহুগুণ বেশি। কেবল শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণের হার কিছুটা বেশি—১২.৬ শতাংশ। দেশটি তিন বছর আগে দেউলিয়া ঘোষণা দিয়েছিল এবং ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটেও ছিল। কিন্তু নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা এখন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় থাকা পাকিস্তানও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গত দুই বছরে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার ৭.৪ শতাংশ। ভারতের ব্যাংকিং খাতে এ হার আরও কম—মাত্র ২.৩ শতাংশ। নেপালের ক্ষেত্রেও খেলাপির হার ৪.৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার থাকা এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—সিঙ্গাপুরে খেলাপি ঋণের হার ১.৩ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১.৪ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ২.৭ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৩.৩ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৫.৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ২.১ শতাংশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনে এ হার মাত্র দেড় শতাংশ, আর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ১.৭ শতাংশে সীমিত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর শেষে (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায়—যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরে এই খেলাপি ঋণের অঙ্ক ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা এবং সেই সময়ে হার ছিল ২০.২ শতাংশ।

অর্থাৎ মাত্র নয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা—যা নজিরবিহীন বৃদ্ধি। একই সঙ্গে, বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে গত পঁচিশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। সহিংসতার মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরের মাস তথা গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায় ঠেকে। গত দেড় দশকে বহু খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক হার অপ্রত্যাশিত ছিল না বলে জানিয়েছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ গভর্নর স্যার ৬ মাস আগেই বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।’

আগামীতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি; বলেন, ‘যা হওয়ার হয়েছে। এখন খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসহায়তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। আশা করছি, ডিসেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণ কমে আসবে। আর অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার এখন ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ত্রৈমাসিকে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করে থাকে। এর আগে মার্চ প্রান্তিকের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা ছিল খেলাপি।

সর্বশেষ প্রকাশিত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো মোট ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বিতরণ হওয়া ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশই খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের জমা অর্থ থেকেই ঋণ দেয়। তাই আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়। কোনো ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে সেই ঋণের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা থেকে বরাদ্দ রেখে সঞ্চিতি তৈরি করতে হয়। সঞ্চিতি ঘাটতি মানে সেই পরিমাণ আমানত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে এবং ব্যাংকের মূলধনও ঝুঁকিতে রয়েছে।

খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকিং খাতে সঞ্চিতি ঘাটতিও ভয়াবহ হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। কিন্তু সঞ্চিতি রাখা হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। এতে সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা।

মার্চ প্রান্তিকে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসেই সঞ্চিতি ঘাটতি বেড়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা—যা নির্দেশ করে, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে কোনো সুরক্ষামূলক অর্থ সংরক্ষণ করতেই পারেনি ব্যাংকগুলো।

গভর্নর হিসেবে ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের নামে নানামুখী পদক্ষেপ নেন। ভেঙে দেন ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা হয়। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যদিও এমন সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের শুরু হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইতিমধ্যে। একটি উগ্রবাদী রাজনৈতিক দলের অধীনে ব্যাংকিং খাতকে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে দেখছেন তারা। ধারণা করা হচ্ছে, আগামীতে আরো কয়েকটি ব্যাংক একীভূত কিংবা অবসায়নের কাজ এগিয়ে চলছে।

ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক ক্ষতের তুলনায় ইউনূস সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপকে যথেষ্ট বলে মনে করছেন না অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারত। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সাজা হলে অন্যরা শিক্ষা নিতো, কিন্তু তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। যেসব সংস্কার কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, সেসব শেষ করাও বেশ কঠিন। তবে আমরা আশাবাদী হতে চাই। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আগামী দুই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু করে দেখাক।’

Visited 25 times, 1 visit(s) today