নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৬ আগস্ট ২০২৫:
গত বছরের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ২,২০০ বন্দির মধ্যে এখনো ৭০০ জন ধরা পড়েনি, যাদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং জঙ্গি সংশ্লিষ্ট আসামিরা রয়েছেন। অথচ, এই ভয়ংকর অপরাধীদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হলেও, জুলাই মামলার নামে নামে-বেনামে লাখো রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র এবং খেটে খাওয়া সাধারণ জনতাকে আটক করে কারাগার ভরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কারাগারে বিশৃঙ্খলা ও পলায়ন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের পাঁচটি কারাগার—নরসিংদী, গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার, সাতক্ষীরা, শেরপুর এবং কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে—ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা কারাগারের ফটক ভেঙে, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং অস্ত্র লুট করে। এ সময় ২,২৪০ বন্দি পালিয়ে যায়, যাদের মধ্যে হত্যা, ডাকাতি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন আসামিরা ছিলেন।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২০২ জন পালিয়ে যায়, যাদের অধিকাংশ জঙ্গিবাদের মামলায় কারাবন্দি ছিলেন। এর মধ্যে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ১৩৭ জন এখনো পলাতক। নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬ জন পালালেও ৬৮৪ জন গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণ করেছে, তবে ১৪২ জন ধরা পড়েনি। সাতক্ষীরা থেকে ৫৯৬ জন পালালেও ৫৫২ জন ফিরে এসেছে বা গ্রেপ্তার হয়েছে, এখনো ৪৪ জন পলাতক। শেরপুর থেকে ৫১৮ জন পালিয়ে যায়, যাদের মধ্যে ৩৮০ জন এখনো ধরা পড়েনি। কুষ্টিয়া থেকে ৯৮ জন পালালেও ১৭ জন পলাতক, যাদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং ৯ জন জঙ্গি। মোট পলাতকদের মধ্যে ৭০ জন জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তসহ অতি ঝুঁকিপূর্ণ আসামি।
জুলাই মামলায় গণগ্রেপ্তার
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘জুলাই মামলা’র নামে সারাদেশে লাখো রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র এবং সাধারণ খেটে খাওয়া জনতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই গ্রেপ্তারের অধিকাংশই নামে-বেনামে এবং অপর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে হয়েছে। একজন মানবাধিকার কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভয়ংকর অপরাধী ও জঙ্গিরা পলাতক থাকলেও সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সাধারণ মানুষ, ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে মামলা দিয়ে কারাগার ভরে রেখেছে।”
কারা মহাপরিদর্শক জানান, বর্তমানে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে ২৩,০০০ বেশি বন্দি রয়েছে। দেশের ৬৯টি কারাগারে ধারণক্ষমতা ৪২,০০০ হলেও বন্দির সংখ্যা ৬৫,০০০। এই অতিরিক্ত বন্দির মধ্যে বেশিরভাগই জুলাই মামলায় আটককৃত রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র এবং সাধারণ জনতা।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অস্ত্র লুট পলায়নের সময় হামলাকারীরা ৯৪টি শটগান ও চাইনিজ রাইফেল লুট করে, যার মধ্যে ২০টি এখনো উদ্ধার হয়নি। শেরপুর কারাগার থেকে ১,১৭৫ রাউন্ড গুলি লুট হয়, যা আইনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে। মহাপরিদর্শক বলেন, “পলাতক এই বন্দিরা, বিশেষ করে জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা, আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি। আমরা তাদের গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।” তবে, ধারণা করা হচ্ছে, কিছু বন্দি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
কারাগারের দুর্বলতা ও সংস্কার প্রচেষ্টা কারা মহাপরিদর্শক স্বীকার করেন, কারাগারের অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এই সংকটের জন্য আংশিকভাবে দায়ী। দেশের ১৭টি কারাগার পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তা জোরদারে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল স্থাপন, ডগ স্কোয়াড মোতায়েন, ২৪ ঘণ্টা হটলাইন এবং আরএফআইডি ও জিপিএস-ভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, কারা অধিদপ্তরের নৌকা প্রতীকযুক্ত লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জুলাই মামলায় লাখো মানুষের গ্রেপ্তার এবং পলাতক ভয়ংকর অপরাধীদের ধরতে ব্যর্থতা নিয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয় একজন রাজনৈতিক কর্মী বলেন, “জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পালিয়ে গেলেও তাদের ধরা হচ্ছে না। অথচ, নিরীহ ছাত্র, কর্মী ও খেটে খাওয়া মানুষকে জেলে ভরা হচ্ছে। এটা কোন ন্যায়বিচার?” মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই গণগ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও জঙ্গি সংশ্লিষ্ট ৭০০ পলাতক বন্দি আইনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে, অথচ জুলাই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত লাখো রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র ও সাধারণ জনতা কারাগারে বন্দি। এই দ্বৈত নীতি সরকারের বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কারাগার সংস্কার, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং পলাতক বন্দিদের গ্রেপ্তারে জরুরি পদক্ষেপ ছাড়াও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
