কালচারাল ফ্যাসিজম না, এটা কালচারাল ফ্রীডম।

কালচারাল ফ্যাসিজম না, এটা কালচারাল ফ্রীডম।
শেয়ার করুন
এ.এস.এম. শরিফুল হাসান
(অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট)
গতকাল ১৫ আগস্ট ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫০তম শহীদ বার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশবিরোধী চক্র সেনা সদস্যদের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি বা পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিল, এমন ভাবধারা থেকে বঙ্গবন্ধুকে অনেকে ভালোবাসতে পারেনি। এরা বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে সেই ক্ষোভ থেকে। এতে করে বঙ্গবন্ধুর অবদান কমে যায় না। গণ এর ইচ্ছা সমর্থনেই তিনি স্বাধিকারের ডাক দিয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সবচেয়ে নিপীড়িত, দুর্দশাগ্রস্ত অভাবী মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক অবিসংবাদিত নেতা। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক, শ্রমিক, জেলে, কামার, কুমোর, ধোপা সহ সকল সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণী-পেশার মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, মুক্তির সন্ধান দিয়েছিলেন। 
সেই নিপীড়িত অবহেলিত সমাজ আজ অনেকে সুবিধাপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত হয়ে উঠেছে। যারা ধর্মের আলোকে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাখ্যা করে, যারা ইসলামীয়তের আলোকে ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ বাধানোর জন্য বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করে। যারা মনে করে মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র মাসের একটি সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল, যেই যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহন করেনি।
এরা ভুলে যায় মুক্তিযুদ্ধ শুরুর বা এই সশস্ত্র বিপ্লবে পৌঁছানোর লম্বা পথ পরিক্রমা। যারা ইতিহাস শোনে নষ্ট অর্বাচীনদের বয়ানে, বা পড়ে/জানে রেন্টু, শর্মিলা বা পিনাকিদের বর্ণনায়, তারা মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুকে কতোটা চিনলো বা ধারন করলো তাতে ইতিহাসের খুব একটা কিছু যায় আসে না অবশ্য। এই সারফেইস লেভেলের অগভীর জ্ঞান বা ফরমায়েশি ইতিহাস দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ঝোঁক শেষ হলে, ফরমায়েশি জ্ঞানও শেষ হয়।
এতো গেল যারা বঙ্গবন্ধুকে মান্য করে না তাদের কথা।
এদের ঘাড় ধরে কেউ কখনো বঙ্গবন্ধুকে সন্মান করতে বা ভালোবাসতে বলেনি। এরা নিজেরাই নিজেদের গুপ্ত রাখতে বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়েছে, কখনো সুবিধা পেতে, কখনো সান্নিধ্য পেতে, কখনো রুটি-রুজির ধান্দায়। এই যে বঙ্গবন্ধুকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, এটি হতে পারে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা।
যদি চাপিয়ে দেওয়া হতো, বাধ্য করা হতো জোর করে বঙ্গবন্ধুর স্তুতি গাইতে, সেটি হতো কালচারাল ফ্যাসিজম, যে শব্দটি আজ খুব প্রাসঙ্গিক।
আজ রাজু ভাস্কর্যে “কালচারাল ফ্যাসিজম” ট্যাগ দিয়ে অনেক শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষকের ছবিতে “জুতা মারা” কর্মসূচি হয়েছে। যাদের ছবি ঝোলানো হয়েছে, তার কি কাউকে বঙ্গবন্ধুকে সন্মান করতে বাধ্য করেছে? না, বরং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের এই বিপরীত সময়ে তারা জাতির অবিসংবাদিত নেতাকে প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা জানিয়েছে, শোক প্রকাশ করেছে।
মেগাস্টার সাকিব খান থেকে শুরু করে ছোট পর্দার অভিনেত্রী পর্যন্ত অনেকে সন্মানের সঙ্গে স্মরণ করেছেন বঙ্গবন্ধুকে। আরও অনেকে ভয়ে, সন্মান হারানোর লজ্জায় বা মবের হাতে নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কায় ভালোবাসা প্রকাশে নীরব থেকেছেন। কেন শিল্পী সাহিত্যিকরা শ্রদ্ধা জানালো, তাই তাদের উপরে ক্ষিপ্ত জুলাই আন্দোলনকারীরা। এটাই তো ফ্যাসিবাদ, যেখানে মনের ভাব প্রকাশ করা যায় না। ঐতিহাসিক কাউকে সন্মান জানাতে না পারা, কারও মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাতে না পারা!
প্রেস সচিবের কঠোর ব্যবস্থার হুমকি দেওয়া, বা কেউ শোক প্রকাশ করলে তাকে জুতা মারা, মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া! অথচ এই ফ্যাসিজমকে এরা মনে করে স্বাধীনতা, আর স্বাভাবিক অভিব্যক্তির স্বাধীনতাকে নাম দিয়েছে ফ্যাসিবাদ।
এভাবে জোড়া-তালি মারা যুক্তি ও গা-জোয়ারি যুক্তি দিয়ে কিছুই কি প্রতিষ্ঠিত হয়?
বরং এতে মানুষের উষ্মা বাড়ে। এক বছরে জনগণের উষ্মা অনেক বেড়েছে। মেটিকুলাস প্ল্যানের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র করে এক আন্দোলনের মাধ্যমে আপনারা সুন্দর দেশ গঠনের কথা দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অনেকে আশায় ছিলেন, “দেখি না, ভালো কিছু হয় কি না!” কিন্তু না, আপনাদের ঘৃণা, লোভ, হিংসা, প্রতিশোধের স্পৃহা থামার নাম নিচ্ছে না। দেশ উচ্ছন্নে যাচ্ছে, জনগণের নিরাপত্তা হুমকির মুখে, নাগরিক অধিকার শূন্যে। অথচ আমরা নতুন নতুন সংজ্ঞা শিখছি। অরাজকতা হয়ে যাচ্ছে সুশাসন, ফ্যাসিবাদ হয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতা, মব হয়ে যাচ্ছে প্রেশারগ্রুপ, জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে ছাত্র-জনতা, শ্রেণী উন্নয়ন হয়ে যাচ্ছে লুটপাট, অবকাঠামো উন্নয়ন হয়ে যাচ্ছে অযথা খরচ।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়নি আপনাদের। যেভাবে পুস্তকের ইতিহাস জ্ঞান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুকে ব্যাখ্যা করছেন, তাতে আপনাদের কাছে ইতিহাসের শিক্ষা আশা করাটা বাতুলতা মাত্র।
Visited 9 times, 1 visit(s) today