আন্তর্জাতিক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি যে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছে, তা নাকচ করে দিয়েছে ভারত সরকার। সরকারি সূত্র এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, রুশ তেল আমদানি বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশটি তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখছে। এই অবস্থান ব্রিকস জোটের নীতি ও মাল্টিপোলার বিশ্ব গঠনের প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে, যা দেশটির সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার উপর জোর দেয়।
সম্প্রতি, ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারগুলো—ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যালস—গত এক সপ্তাহে রুশ তেল কেনা বন্ধ করেছে। এর পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি এবং রুশ তেলে ছাড় কমে যাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন,
“শক্তি সম্পদ আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা জাতীয় স্বার্থ এবং বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তেল আমদানি করি।” তিনি আরও জানান, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে, এবং তেল আমদানি বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
ট্রাম্পের হুমকি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১৪ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, যদি না মস্কো ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এছাড়া, ১ আগস্ট থেকে ভারতের পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক এবং রুশ তেল কেনার জন্য অতিরিক্ত জরিমানার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই হুমকির পেছনে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সমর্থন বন্ধ করার উদ্দেশ্য কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারত, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ, বর্তমানে তার মোট তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জেরে রাশিয়া কম দামে তেল বিক্রি শুরু করলে ভারত এই সুযোগ গ্রহণ করে। এই বাণিজ্য ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাশিয়ার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ, এই তেল কেনার মাধ্যমে ভারত পরোক্ষভাবে রাশিয়ার যুদ্ধকে সমর্থন দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ভারত তার জাতীয় স্বার্থ এবং শক্তি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। পশ্চিমা চাপের মুখেও ভারতের এই অবস্থান ব্রিকস জোটের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা একটি মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে কাজ করে। সম্প্রতি প্রচারিত একটি গুজব যে ভারত, চীন ও রাশিয়া মিলে পৃথক জোট গঠন করতে পারে, তা চীন ও রাশিয়া উভয়ই অপ্রয়োজনীয় বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এটি ব্রিকসের প্রতি তাদের আস্থা এবং জোটের অখণ্ডতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে।
তবে ভারতের জন্য পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী ১০ দিনের মধ্যে রাশিয়ার উপর সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যার মধ্যে সেকেন্ডারি ট্রেডে জড়িত দেশগুলোও পড়তে পারে। এর ফলে ভারতের মতো দেশগুলোর উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। ভারত বিকল্প হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে তেল আমদানির দিকে ঝুঁকলেও, রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং অর্থনৈতিক সুবিধা দেশটিকে তার বর্তমান অবস্থানে অটল রাখতে পারে।
ভারতের এই দৃঢ় অবস্থান শুধু তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়, বরং একটি মাল্টিপোলার বিশ্ব গঠনে ব্রিকস জোটের নীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনগুলোতে ভারত কীভাবে এই ভূ-রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে এবং তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখে, তা বিশ্ব মঞ্চে দেশটির ভূমিকাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
