জুলাইকে মানি মেকিং মেশিনে পরিণত করে আমাকে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা এক বিস্ফোরক ফেসবুক লাইভে আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, দখলবাজি, চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বলেন—রাজধানীর হেয়ার রোডের উপদেষ্টাদের বাসা থেকে এই প্ল্যাটফর্মের ভেতরেই গড়ে উঠেছে একটি ছায়া নেটওয়ার্ক।
“সব সিদ্ধান্ত হতো হেয়ার রোডে বসে, আমি শুধু বাস্তবায়ন করতাম,” বলেন উমামা।
অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া এবং তথ্য ও আইসিটি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বৈছা আন্দোলনের উপদেষ্টা হওয়ার পরেও দুইজনেই হেয়ার রোডের বাসা থেকেই প্ল্যাটফর্মটি পরিচালনা, সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ হয়ে আসছিল বলে অভিযোগ করেন উমামা ফাতেমা।
গতকাল রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে এসে এসব কথা বলেন বৈছা আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা।
২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের ওই লাইভে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া থেকে শুরু করে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত নানা ঘটনা ও তথ্য তুলে ধরেন তিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে থাকাটা তার জীবনের একটা ‘ট্র্যাজিক’ ঘটনা ছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্ল্যাটফর্মটির সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা।
সম্প্রতি গুলশানে সাবেক স্বৈরাচার সরকারের আলোচিত এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় ১ কোটি টাকা চাঁদা তুলতে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক বিন সোলায়মান রিয়াদসহ পাঁচজন হাতেনাতে ধরা পড়েন। শাম্মীর লোকজন তাদের হাতে ১০ লাখ টাকা দেন এবং পুলিশে খবর দেন। পরে গুলশান থানা পুলিশ চাঁদাসহ অভিযুক্তদের আটক করে।
এ ঘটনার পরে থেকে দেশব্যাপী সমালোচনা শুরু হলে লাইভে এসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা কান্নায় ভেঙ্গে প্ল্যাটফর্মটির ‘অনেক মুখোশ’ খুলে দিয়েছেন বলে মনে করছেন সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকর্মী।
‘আমি পুরো প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম’ বলেও দাবি করেছেন সংগঠনটির সাবেক এ মুখপাত্র।
“বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র হওয়ার পর প্রথম আবিষ্কার করেছি যে এগুলো দিয়ে লোকজন নানা কিছু করছে। আমার কখনো মাথায়ই আসেনি যে এগুলো দিয়ে টাকা-পয়সা ইনকাম করা যায়।”
“৫ আগস্টের পরদিন সকালবেলা থেকেই দেখি, সমন্বয়ক পরিচয়ে একেকজন একেক জায়গায় দখল করছে! গতকাল পর্যন্ত তো সমন্বয়ক পরিচয়টাই কেউ নিতে চাইছিল না, আর আজ শুনি সবাই দখল করছে এই পরিচয়ে।”
উমামা ফাতেমা বলেন, “মুখপাত্র হওয়ার আগে এসবের কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু পরে দেখলাম—টেন্ডার বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য, ডিসি নিয়োগ, তমুক জায়গায় তমুক কাজ—এসব অহরহ করে বেড়াচ্ছে।”
তিনি বলেন, “অনেকে বলেন আমি হাজার-কোটি টাকা কামিয়েছি। আমি শুধু বলতে পারি, আই হ্যাভ এ প্রিটি গুড লাইফ। আমি ওয়েল-অফ ফ্যামিলি থেকে এসেছি। আমার পরিবার আমাকে টাকার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করে না।”
‘চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি আর শেল্টার দেওয়া—এসব অভিযোগের কথা আমি জানতাম। শুধু চট্টগ্রামের কাহিনি ধরলেই অনেকের প্যান্ট খুলে যেত’ বলে অভিযোগ করেন উমামা ফাতেমা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ও বৈছা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফির বিরুদ্ধেও ওঠেছে চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাফির ব্যক্তিগত বিকাশ অ্যাকাউন্টে ৬১ লাখ টাকার বেশি এবং তার মায়ের নামে খোলা আরেকটি অ্যাকাউন্টে ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে। এছাড়া তার নামে খোলা বাইন্যান্স অ্যাকাউন্টে ২৬ লাখ ৮৪ হাজার ৯০০ ডলার রয়েছে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৩২ কোটি টাকা।
রাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—চট্টগ্রাম বন্দরে গোপন তদবির, আমেরিকা-পাকিস্তানভিত্তিক বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ, এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকৌশলীদের চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য চাপ প্রয়োগ। তিনি বিদ্যুৎ উপবিভাগের প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশকে চাকরিতে ফেরাতে লবিং করেন এবং হৃদয় তনুয়া হত্যা মামলার বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান, কেন মামলার আগে তাকে জানানো হয়নি।
এসব তথ্য চেপে যাওয়ার বিষয়টির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন উমামা ফাতেমা।
‘আমাকে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে’
উমামা বলেন, “৩১শে ডিসেম্বরের ঘোষণাপত্রের কর্মসূচি হঠাৎ ঘোষণা করে বাতিল করা হয়। পরে জানুয়ারিতে শুনি তারা দল গঠনের প্রক্রিয়ায় ঢুকে গেছে। আমি আগ্রহী ছিলাম না। ফেব্রুয়ারিতে যখন কেউ এসে বলল, নতুন করে প্ল্যাটফর্ম গড়ি, তখন আবার অভিযোগ উঠলো আমি প্ল্যাটফর্ম দখলের চেষ্টা করছি।”
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আপনি আমাকে ডেকে এনে একটা টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করেছেন। আমি টিস্যু পেপার না তো!”
উমামা আরও বলেন, “ন্যূনতম আত্মসম্মান আছে, এমন কেউ এই প্ল্যাটফর্মে টিকতে পারবে না। আমার কাছে এই প্ল্যাটফর্মটা খুব বেশি মূল্যবান ছিল না, কিন্তু অনেকের কাছে ছিল—কারণ এটা নিয়ে ডিসি-এসপি অফিসে দৌড়ানো যেত।”
তিনি বলেন, “আমার অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। আমি যদি একা কিছু করতাম, দেশের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারতাম।”
ফেনী ও মৌলভীবাজারে নতুন বিতর্ক
ফেনীতে বৈছা আন্দোলনের সমন্বয়ক ওমর ফারুক শুভকে ৩ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ফেনী আলিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসানের কাছে চাঁদা দাবি করেন।
মৌলভীবাজার জেলা শাখায় মামলাবাণিজ্যের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুই কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জেলা সমন্বয়ক সুমন ভূঁইয়া বলেছেন, “অনেকে মামলা করেছে, আবার মামলাকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য করছে। তাই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
