খাবারের গন্ধের অজুহাতে মিরপুরের চাকমা দম্পতির হেবাং রেস্টুরেন্টে মব সন্ত্রাসীদের হামলা

খাবারের গন্ধের অজুহাতে মিরপুরের চাকমা দম্পতির হেবাং রেস্টুরেন্টে মব সন্ত্রাসীদের হামলা
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৭ জুলাই ২০২৫

রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়ায় চাকমা দম্পতির মালিকানাধীন জনপ্রিয় পাহাড়ি খাবারের রেস্টুরেন্ট ‘হেবাং’-এ গতকাল শনিবার রাতে মব সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফুড ব্লগারদের ভিডিওর সৌজন্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করা এই রেস্টুরেন্টে হামলার মূল কারণ হিসেবে ‘নাপ্পি’ নামক একটি পাহাড়ি খাবারের গন্ধকে দায়ী করা হচ্ছে। এ ঘটনায় রেস্টুরেন্টে ভাঙচুর হয়েছে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শনিবার রাত ৮টার দিকে একদল লোক রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে এবং ‘নাপ্পি’ নামক খাবারের গন্ধের কারণে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তাদের দাবি, এই খাবার থেকে শুঁটকির মতো তীব্র গন্ধ ছড়ায়, যা এলাকার বাঙালি মুসলিম বাসিন্দাদের জন্য অস্বস্তিকর। তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে মব সন্ত্রাসীরা আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং রেস্টুরেন্ট বন্ধ করার দাবি জানায়।

হেবাং রেস্টুরেন্ট ২০১৮ সালে প্রিয়াঙ্কা চাকমা ও তার স্বামী মিলন চাকমার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফুড ব্লগার ফাহিম, আদনানসহ আরও অনেকে এই রেস্টুরেন্টের পাহাড়ি খাবার, বিশেষ করে বাঁশে রান্না করা ‘সুমোত দি তোন’, পাজন এবং ‘নাপ্পি’র জন্য ভিডিও তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করেছেন। এতে রেস্টুরেন্টটি স্থানীয় ও পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তবে ‘নাপ্পি’, যা পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী গাঁজানো মাছ বা শুঁটকির মতো উপাদান দিয়ে তৈরি, তার গন্ধ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

রেস্টুরেন্টের মালিক প্রিয়াঙ্কা চাকমা বলেন, “আমরা আমাদের সংস্কৃতির খাবার পরিবেশন করছি। ‘নাপ্পি’ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এটি শুঁটকির মতোই, যা বাঙালিরাও খান। কিন্তু হঠাৎ কিছু লোক এসে গন্ধের অজুহাতে ভাঙচুর করেছে। এতে আমাদের ব্যবসার বড় ক্ষতি হয়েছে।”

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন জানান, “আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করেছি। তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দোষীদের শনাক্ত করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলেন, শুঁটকির মতো গন্ধযুক্ত খাবার এলাকায় অস্বস্তি সৃষ্টি করে, অন্যরা এই হামলাকে সাংস্কৃতিক বৈষম্য হিসেবে দেখছেন।

একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “আমরাও শুঁটকি খাই, কিন্তু তাই বলে কারও ব্যবসায় হামলা করা ঠিক নয়।”

পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, “নাপ্পির গন্ধ নিয়ে অজুহাত তৈরি করে চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যবসার ওপর হামলা বৈষম্যমূলক আচরণ। আমরা এর বিচার দাবি করছি।”

প্রিয়াঙ্কা চাকমা জানিয়েছেন, তারা ক্ষতি পুষিয়ে দ্রুত ব্যবসা পুনরায় চালু করতে চান।

তিনি বলেন, “আমাদের গ্রাহক ও ফুড ব্লগারদের সমর্থন আমাদের শক্তি। আমরা হাল ছাড়ব না।”

Visited 27 times, 1 visit(s) today