জুলাই সংস্কারে রাতের নিয়োগ: গোপন আঁতাতে সরকারি চিকিৎসক নিয়োগ ৬৫ জন

জুলাই সংস্কারে রাতের নিয়োগ: গোপন আঁতাতে সরকারি চিকিৎসক নিয়োগ ৬৫ জন
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দালিলিকভাবে কোনো প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও অতি প্রচারে ‘রাতের ভোট’ প্রপঞ্চ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। সকল অনিয়ম দূর করে ‘সংস্কার’-এর ডালা নিয়ে হাজির হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সংস্কার তো হয়নি, উল্টো রাতের আঁধারে গোপনে ৬৫ জন সরকারি চিকিৎসক নিয়োগের ঘটনায় শুরু হয়েছে তোলপাড়।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে জনমনে উঠেছে প্রশ্নের ঝড়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই নিয়োগ অত্যন্ত দ্রুত ও গোপনে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বা নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও স্বজনপ্রীতির প্রভাব পড়েছে। ফলে, যোগ্য চিকিৎসকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর জনস্বাস্থ্য সেবার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ৬৫ জন চিকিৎসক নিয়োগকে ‘রাতের ভোট’ আখ্যা দিয়ে বঞ্চিত ও সাধারণ চিকিৎসকরা বৃহস্পতিবার রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের সামনে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তোলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা মূল্যায়ন, মেধাক্রম অনুযায়ী ফল প্রকাশ ও প্রজ্ঞাপন- কোনোটিই হয়নি, অথচ এত মানুষ নিয়োগ পেলেন কীভাবে!

চলতি বছরের ১২ ও ১৩ই এপ্রিল হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের ২২ ও ২৩তম সভার পর ৩০শে জুনের মধ্যে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদেই সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকরা বলেন, কোনো বিশেষ অবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগ (অ্যাডহক ভিত্তিতে) হতে পারে। তবে সরকারি হাসপাতাল বা স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে এমন নিয়োগ দেওয়া যায় না। কোনো ধরনের সার্কুলার বা নিয়োগ পরীক্ষার তোয়াক্কা না করে লোকচক্ষুর অন্তরালে এ নিয়োগ হয়েছে। এখানে যতজন আবেদন করেছেন, ততজনেরই নিয়োগ হয়েছে। তাও হয়েছে অন্ধকারে।

নিয়োগপ্রাপ্তরা নিজেদের বৈধ দাবি করছেন, আপনারা কেন বিরোধিতা করছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বঞ্চিত চিকিৎসকরা বলেন, আমাদের দায়িত্ব এই অনিয়মের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরা। এমন একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নিয়োগ কেন হবে? যেখানে সুযোগ আছে সার্কুলার দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া। সেটাই করতে হবে।

যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে কিনা, জানতে চাইলে ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা বলেন, টেবিলের নিচে লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ হলে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই যোগ্যতার প্রশ্ন ওঠে। তারা যোগ্য হলে লড়াই করে এই পদে আসতেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ফার্টিলিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. এসএম খালিদুজ্জামান এ নিয়োগ বাতিল করে নতুন নিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা চাই, এই নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে আবার নিয়োগ দেওয়া হোক। মেধার ভিত্তিতে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।

এ সময় চিকিৎসকরা স্লোগান তোলেন, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘নব্য ফ্যাসিস্টদের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।’ তারা বলেন, ‘কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ৬৫ জন নিয়োগ হয়েছে, যা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের মতো এমন একটি প্রতিষ্ঠানে এভাবে স্বচ্ছতা ছাড়া নিয়োগ কোনোভাবে কাম্য নয়। আমরা আমাদের সম্মানিত শিক্ষকদের অনুরোধ করব, যাতে চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়।’

একদিকে সরকার জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে এই দ্রুত নিয়োগের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে সমালোচকরা এটিকে অস্বচ্ছ ও সন্দেহজনক বলে আখ্যা দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এমন গোপন প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছেন।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সকল পর্যায়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও, গোপনে চিকিৎসক নিয়োগের ঘটনা প্রমাণ করছে— অনিয়ম দূর করতে ব্যর্থ হয়েছেন সংস্কারবাদীরা। স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপের দাবি উঠেছে জোরালোভাবে।

Visited 6 times, 1 visit(s) today