ডেডলাইন টেকনাফ: রজার-ইউনূস চায় আরকান আর্মিকে সহযোগিতা করতে, রোহিঙ্গারা চায় যুদ্ধ!

ডেডলাইন টেকনাফ: রজার-ইউনূস চায় আরকান আর্মিকে সহযোগিতা করতে, রোহিঙ্গারা চায় যুদ্ধ!
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্ভাব্য “মানবিক করিডোর থেকে “ত্রান চ্যানেল” নিয়ে সহযোগীতার আলোচনা চলছে অনেকদিন ধরেই । অন্যদিকে, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গা তরুণরা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ও ‘যুদ্ধ’র প্রস্তুতির কথা বলছে। এই পরিস্থিতিতে টেকনাফ কি পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন এখন সবার মনে।

বিবিসি বাংলার একটি সরেজমিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে থাকা তরুণদের একটি বড় অংশ আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা মনে করে, মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে রাখাইনে একটি স্বাধীন অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করাই তাদের লক্ষ্য। একজন রোহিঙ্গা তরুণ প্রতিবেদনে বলেছেন, “আমরা যুদ্ধ করবো। আরাকান আর্মির সাথে। আমরা স্বাধীনতা চাই।” এই তরুণরা মনে করেন, আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ তাদের প্রত্যাবাসন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ “‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার: রোহিঙ্গা বিদ্রোহের ঝুঁকি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো শিবিরের মধ্যে সহিংসতা কমাতে এই গোষ্ঠীগুলোর প্রতি কিছুটা সমর্থন দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার মার্কিন প্রেস্ক্রিপশনে আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারকে রাখাইন থেকে উৎখাত করার পর আরাকান আর্মি এই অঞ্চলের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্তসহ ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরাকান আর্মি বড় ধরনের সমস্যার জায়গা। আমরা না পারছি তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে, না পারছি তাদের এড়িয়ে যেতে।” এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মাধ্যমে এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে। কিছু সূত্রের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছে, যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।

এদিকে, টেকনাফে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান তৎপরতা স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত সাত মাসে আরাকান আর্মি নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে অন্তত ২২০ জেলেকে অপহরণ করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা উভয়ই রয়েছে। যদিও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অনেককে ফিরিয়ে এনেছে, তবু জেলেদের নৌকা ও জাল ফেরত দেওয়া হয়নি, যা তাদের জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় জেলে খলিলুর রহমান বলেন, “আরাকান আর্মির কারণে আমরা সাগরে মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছি। আমাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে গেছে।”

আরাকান আর্মির তৎপরতা শুধু জেলেদের উপরই সীমাবদ্ধ নয়। তারা টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে। গত জানুয়ারি থেকে মিয়ানমার থেকে পণ্যবাহী জাহাজ আটকে দেওয়া এবং সীমান্তে নৌ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারির মতো ঘটনা বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া, আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশের সীমানা লঙ্ঘন করে বান্দরবানের থানচি উপজেলায় প্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা জামায়াতে ইসলামী তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে আরাকান আর্মির প্রতি ক্ষোভের অন্যতম কারণ তাদের নাগরিকত্ব ও অধিকারের বিষয়ে আরাকান আর্মির অস্পষ্ট অবস্থান। রাখাইনে এখনো প্রায় সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে, যারা আরাকান আর্মির নিপীড়ন ও জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগের ভয়ে পালিয়ে আসছে। একজন রোহিঙ্গা যুবক বলেন, “আমরা আরাকান আর্মির পাশে থেকে লড়তে চাই, তবে তারা প্রথমে আমাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করুক।”

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস রাখাইনে মানবিক সহায়তা করিডোর চালুর জন্য বাংলাদেশ সরকার ও আরাকান আর্মির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এই করিডোরকে ‘ব্লাডি করিডোর’ আখ্যা দিয়ে বিরোধিতা করেছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা চুক্তি সীমান্তে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে টেকনাফে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি নজরদারি বাড়িয়েছে, তবে দুর্গম পথ দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হচ্ছে।

টেকনাফের বাসিন্দারা এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, “আরাকান আর্মির কারণে আমাদের বাণিজ্য বন্ধ, জেলেরা সাগরে যেতে পারছে না। এখন রোহিঙ্গারা যদি যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে এই এলাকা আরও বিপদের মুখে পড়বে।” রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ার পাশাপাশি সীমান্তে সংঘাতের আশঙ্কা টেকনাফকে একটি সম্ভাব্য ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

 

তথ্যসূত্র:
বিবিসি বাংলা, “আরাকান আর্মির সাথে ‘লড়াইয়ের প্রস্তুতির’ কথা বলছে রোহিঙ্গারা, সরেজমিন প্রতিবেদন,” ২৭ জুন ২০২৫
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ, “বাংলাদেশ-মিয়ানমার: রোহিঙ্গা বিদ্রোহের ঝুঁকি,” ১৮ জুন ২০২৫
প্রথম আলো, “আরাকান আর্মির বাধা, সাগরে যেতে ভয় পান টেকনাফের জেলেরা,” ২৩ জুন ২০২৫
সমকাল, “সাত মাসে ২২০ জেলেকে অপহরণ আরাকান আর্মির,” ১৯ মে ২০২৫
বাংলা ট্রিবিউন, “রাখাইনে নতুন বাস্তবতা: আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগে বাংলাদেশ ও ভারত,” ৫ জুন ২০২৫
দ্য ডেইলি স্টার, “আরাকান আর্মির নিপীড়ন বাড়ছে, মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন আসছে ৩০-৪০ রোহিঙ্গা,” ৬ মে ২০২৫
সমকাল, “বাংলাদেশ ও আরাকান আর্মিকে করিডোর দিতে বলল ফোর্টিফাই রাইটস,” ১৩ মার্চ ২০২৫
বাংলা ট্রিবিউন, “আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের প্রশ্ন উঠছে কেন,” ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪
Visited 9 times, 1 visit(s) today