নিজস্ব প্রতিবেদক
দলবদ্ধ সহিংসতায় (মব সন্ত্রাস) লাগাম টানতে পারছেনা অন্তর্বর্তী সরককর। এতে নীরিহ সাধারণ মানুষের প্রাণহানিসহ শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এসব ঘটনা ঘটলেও সরকারি বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসেব অনুযায়ী, গত ১০ মাসে মবের হাতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭৪ জন। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৮৩ জন। আহত হয়েছেন কয়েক শ মানুষ। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো ঘোষণা দিলেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেনা সরকার।
সেনাপ্রধান একাধিকবার তার বিভিন্ন বক্তব্যে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতায় আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব নিলেও অনেক ঘটনায় সেনা সদস্যদের উপস্থিতিতেই মব সন্ত্রাস ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বশীল বাহিনীগুলোর হুঁশিয়ারির কোনো তোয়াক্কা করছেনা মব সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী।
আলোচিত সব ঘটনার পরও অপরাধীদের গ্রেপ্তার, বিচারের আওতায় আনা কিংবা বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ রাষ্ট্র এখনো দেখাতে পারেনি। এমনকি কিছু ঘটনায় দেখা গেছে— সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিরাই মব গঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের অংশগ্রহণে মবের ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে প্রশাসন নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করছে। পুলিশের সামনেই মানুষ লাঞ্ছিত হচ্ছে, হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশের সদস্যরাও।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় উত্তরা এলাকায় সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম নূরুল হুদার বাসায় প্রকাশ্যে হামলা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে গলা ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিচে নামানো হয়েছে এবং অপমানজনক আচরণ করা হয়েছে। বিএনপির অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতাকর্মী পরিকল্পিতভাবে এই মব তৈরি করে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এই মব সন্ত্রাসীদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে।
এ ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও এ পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। মব সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ঘুরছে। সরকারের মুখপাত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা একের পর এক বিবৃতি দিলেও কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) একাধিক বিবৃতিতে বলেছে, বিচারবহির্ভূত সহিংসতা ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা শুধু ব্যক্তি অধিকার নয়—গণতন্ত্র, সংবিধান ও আইনের শাসনের ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্র যদি ন্যায্য বিচার নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়, বিচার ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রতিহিংসার পথ প্রশ্রয় পায়। তখন ক্ষমতাবানদের নির্দেশে বা উৎসাহে গড়ে ওঠা মব সন্ত্রাস সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতেই যখন মব হামলা হয়, তখন এটিকে দুর্বলতা নয়, বরং ইচ্ছাকৃত প্রশ্রয় হিসেবেই দেখছেন সাধারণ মানুষ।
তিনি বলেন, মব যেন সংক্রামক ব্যাধির মতো—একবার লাগামছাড়া হলে এর শিকার হতে পারেন যেকোনো মানুষ।
সরকার যদিও মব সন্ত্রাস বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে, তবে বাস্তবচিত্র বলছে— এমন অনেক ঘটনায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত দল এনসিপি, বিএনপি, জামায়াতের নেতাকর্মীরা জড়িত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব গোষ্ঠীই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা পাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোরালো দাবি, মব সন্ত্রাসে জড়িতদের যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যেই গলা টিপে ধরা হবে নাগরিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারকে।
সরকারের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু এই সহিংস গোষ্ঠীগুলোকেই উৎসাহিত করছে না, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক কাঠামোকেই নড়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন সুধীজন। এর খেসারত একদিন তাদেরকেও দিতে হবে বলে মনে করেন তারা।
