-আলম মাসুদ
লেখক ও গবেষক
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্ব শেষে ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠিত হয় হাজার মাইল ব্যবধানে অবস্থান করা দুইটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চল নিয়ে। আমাদের বাংলাদেশ তখন প্রথমে পূর্ব বঙ্গ ও পরে পুর্ব পাকিস্তান নামে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের অংশ। আমাদের বাঙালি জনসংখ্যা ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ রপ্তানি হতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তবে, পাকিস্তানের উর্দুভাষী শাসকদের চক্রান্তে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আনুপাতিক ছিল না। বছরের পর বছর পূর্ব পাকিস্তান আঞ্চলিক ভিত্তিতে ক্রমাগত বৈষম্যের শিকার হয়েছে – শাসকদের আঘাত এসেছে আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।
বাংলার এই ২৪ বছরের মুক্তির সংগ্রামের অন্যতম ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হল ছয় দফা আন্দোলন। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘৬ দফা দাবি’ পেশ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয়দফা প্রস্তাব এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি সংগৃহীত হয়। পাশাপাশি ছয় দফা আমাদের বাঁচার দাবি শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়।
১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ জনগনের সামনে ‘ছয় দফা’কে উত্থাপন করা হলে বাঙালি তাদের মুক্তিসনদ হিসেবে একে মনেপ্রানে গ্রহণ করে এর সপক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলে। সেবছরই ৭ জুন ৬ দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়। এই দিনে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হক, মুজিবুল হকসহ মোট ১১ জন বাঙালি নিহত হন। ৬ দফা আন্দোলনে প্রথম নিহত হয়েছিলেন সিলেটের মনু মিয়া। আসলে ‘ছয় দফা’ মূলত স্বাধীনতার ‘এক দফা’ ছিল। ছয় দফার মধ্যেই স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। যার প্রমাণ ৫ বছর পরই সফল হয়ে উঠে।
১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ মুজিবুর রহমান তখন ‘বঙ্গবন্ধু’ – বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালি মুক্তির একমাত্র আশা ভরসা – তাঁর গতিময় নেতৃত্বে বাঙালির অধিকার আদায় তখন অতি সন্নিকটে। সেই সময়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠির বিনোদনের অন্যতম হাতিয়ার চলচ্চিত্র। পর্দায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নবাব সিরাজউদ্দোল্যা (খান আতাউর রহমান, ১৯৬৭), শহীদ তিতুমীর (ইবনে মিজান, ১৯৬৮), জীবন থেকে নেয়া (জহির রায়হান, ১৯৭০), কোথায় যেন দেখেছি (নিজামুল হক, ১৯৭০) প্রভৃতি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। জহির রায়হান আরো বানাচ্ছেন তাঁর অসমাপ্ত লেট দেয়ার বি লাইট।
এই সময় আওয়ামী লীগের উচ্চপদস্ত নেতাদের সম্মতি নিয়েই শেখ ফজলুল হক মনি (১৯৩৯-১৯৭৫) বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা ও ছয় দফা আন্দোলন জনমনে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য বাঙালির মুক্তির ‘ম্যাগনাকার্টা’ ছয় দফা নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শেখ মনি পরিকল্পিত, ১৯৭০ এর নির্বাচনে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমএনএ আবুল খায়ের প্রযোজিত ও ফকরুল আলম পরিচালিত চলচ্চিত্রটির নাম ‘জয় বাংলা’।

‘জয় বাংলা’ – একটি স্লোগান – বাঙালির স্লোগান, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, স্বাধীনতার স্লোগান। স্লোগানটির আবির্ভাব ১৯৬৯ সালে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় এ শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় – ভাঙার গান কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ (১৯২২) কবিতায় তিনি লেখেন –
“জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি অন্তরীণ, জয় যুগে যুগে আসা সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন।”
নবযুগ পত্রিকার ৩রা বৈশাখ ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ (১৯৪২) সংখ্যায় বাঙালির বাঙলা নামে প্রকাশিত প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেন – “বাঙলা বাঙালির হোক। বাঙালির জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।”

স্লোগান হিসেবে “জয় বাংলা” প্রথম উচ্চারিত হয় ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে শিক্ষা দিবস পালনের জন্য কর্মসূচি প্রণয়নের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-এর আহুত সভায় তৎকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আফতাব আহমাদ ও চিশতী হেলালুর রহমান “জয় বাংলা” স্লোগানটি সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেন। এরপর ১৯ জানুয়ারি ১৯৭০-এ ঢাকার পল্টনের এক জনসভায় ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান তার ভাষণে “জয় বাংলা” স্লোগানটি উচ্চারণ করেছিলেন, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে প্রথম “জয় বাংলা” স্লোগানটি উচ্চারণ করেন ৭ মার্চ ১৯৭১-এ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের সেই জনসভার ভাষণে। “জয় বাংলা” স্লোগানটির আগে বাঙালি কখনো এত তীব্র, সংহত ও তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান দেয়নি, যাতে একটি পদেই প্রকাশ পেয়েছে রাজনীতি, সংস্কৃতি, দেশ, ভাষার সৌন্দর্য ও জাতীয় আবেগ। ‘‘জয় বাংলা’’ স্লোগানটিকে সেই সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে ছয় দফা নিয়ে নির্মিত ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
শেখ মনি প্রথম চলচ্চিত্রটির নির্মান নিয়ে আলোচনা করেন চলচ্চিত্রে ব্যতিক্রমী ধারার চিন্তাভাবনার অধিকারী ফকরুল আলমের সাথে। ফকরুল আলম (১৯৪২-২০০৪) মুলত সালাউদ্দিন ঘরনার লোক। পরীক্ষামূলক কাজেও তাঁর আগ্রহ বেশি। মানুষ অমানুষ (১৯৭০), বিন্দু থেকে বৃত্ত (রেবেকা, ১৯৭০), শনিবারের চিঠি (১৯৭৪) প্রভৃতি তাঁর চলচ্চিত্র কর্মের সাক্ষী। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন – তিনি, অভিনেত্রী রাত্রি রায় ওরফে রেবেকা, নাজির হোসেন, মফিজ প্রমুখ জড়িত ছিলেন শেখ মনি ও সিরাজুল আলম খানের বিশেষ ও কিছুটা গোপন আন্দোলনের সাথে।
শেখ মনি ও ফকরুল আলমের আলোচনার পর তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন বাঙালির স্বাধিকার সনদ ‘ছয় দফা’র উপর একটি চলচ্চিত্র বানাবেন। ফকরুল আলম হবেন পরিচালক আর অর্থ দেবেন শিল্পপতি, আওয়ামী লীগ নেতা ও চলচ্চিত্র প্রযোজক (কাগজের নৌকা ও সুতরাং খ্যাত) আবুল খায়ের (১৯২৮-২০১৪)। গল্প ও কাহিনী লেখার জন্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত তরুণ অধ্যাপক ও উদীয়মান সাহিত্যিক পরবর্তীতে আমলা হিসেবে খ্যাত মাহাবুব তালুকদারকে (১৯৪২-২০২২) নিয়ে আসা হয়।
মাহাবুব তালুকদারের তথ্যমতে –
“আমাকে ঢাকায় ডেকে আনা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রাথমিক আলোচনা হয় পরিচালক ফখরুল আলমের সঙ্গে। ষাটের দশকের শুরুতে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। জেনারেল আইয়ুবের সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অবিসংবাদিত ছাত্রনেতা ফখরুল আলম। জয় বাংলা ছায়াছবি সম্পর্কে প্রথম আলোচনায় তিনি জানান, আমাকে জয় বাংলা নামে একটি চলচ্চিত্রের কাহিনি লিখতে হবে, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনা ও পাকিস্তানের শোষণের ইতিহাস বা ঘটনা থাকবে। এ ব্যাপারে শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গেও বিশদ আলাপ করে নেওয়া যেতে পারে। শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৫৯ সালে। তিনি তখনই ছাত্রনেতা, আমি দৈনিক ইত্তেফাকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক। ছায়াছবির কাহিনি সম্পর্কে মণি জানালেন, এই ছবিতে ছয় দফা নিয়ে ছয়টি পৃথক পৃথক গল্প থাকতে হবে। গল্পের মাধ্যমে প্রতিটি দফাকে আলাদাভাবে হাইলাইট করতে হবে। আমি জানতে চাইলাম, ছবিটি কি প্রামাণ্যনির্ভর হবে? অবশ্যই ফিচার ফিল্ম। ছয় দফা নিয়ে ছয়টা গল্প দিয়ে একটা সম্পূর্ণ ছায়াছবি। এটা সম্ভব হবে না। ফিচার ফিল্ম করতে হলে একটি অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক কাহিনি থাকতে হবে। তাহলে তো আমিই লিখতে পারতাম। তোমাকে চট্টগ্রাম থেকে ডেকে আনা হলো কেন? মণি বললেন। আমি বললাম, তুমিই লেখো। ছয়টা পৃথক পৃথক গল্প নিয়ে ছবি বানালে কেবল তিনজন মিলে এ ছবি দেখতে হবে। তুমি, আমি আর ফখরুল। শেখ মণি সুর নরম করে বললেন, ব্যাপারটা কঠিন, আমিও বুঝি। সেজন্যই তো তোমার ওপরে গল্প লেখার ভার। কাহিনি নিয়ে ফখরুল আলমের সঙ্গে আলাপ করে তেমন লাভ হলো না। তিনি জানালেন, শেখ মণির বক্তব্য মেনে কাজটা করতে হবে। ছয়টা পৃথক গল্প নিয়ে একটি ছায়াছবি, চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। আপনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েক দিন ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসে কাজে লেগে যান।
ছবির কাহিনি লিখতে আমি কয়েক দিনের জন্য ঢাকায় এলাম। ছায়াছবির জগতের সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না। এই ছবির সুবাদে এক অনন্য অভিজ্ঞতা ঘটল আমার জীবনে। ফখরুল একটি হোটেলের রুম বুক করলেন আমার জন্য। সার্বক্ষণিক একটি গাড়ি তৈরি রাখা হলো, যা ফোন করা মাত্রই পৌঁছে যাবে। লেখার সঙ্গে গাড়ির কী সম্পর্ক আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। ফখরুল হেসে বললেন, লেখক কি সারাক্ষণ ঘরে বসে লেখেন নাকি? মাঝেমধ্যে বেড়াতে না বেরোলে মাথায় গল্প আসবে কী করে?
গল্পগুলো ফখরুল চিত্রনাট্যের আকারে লিখতে বললেন। কীভাবে চিত্রনাট্য লিখতে হয়, তাও শিখিয়ে দিলেন। চিত্রনাট্য যথাযথ না হলেও তিনি ঠিক করে নেবেন বলে আশ্বস্ত করলেন। আমি ছয় দফা আত্মস্থ করে তার ভেতর থেকে গল্প বের করে আনার চেষ্টা করলাম। হাতে সময় কম বলে প্রথম চারটি গল্প লেখার পরই শুটিং শুরু হলো। শুটিংয়ে আমিও হাজির থাকলাম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংলাপের পরিবর্তন করতে হলো।”
এই চলচ্চিত্রের জন্যেই লিখিত, সুরারোপিত ও ধারণ করা হয় “জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে নিশ্চয়” গানটি – গানটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ, কন্ঠশিল্পি – শাহনাজ বেগম (রহমতউল্ল্যাহ), আব্দুল জব্বার ও সহশিল্পীবৃন্দ। এছাড়াও “ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা” শীর্ষক দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কর্তৃক ১৯০৫ সালে রচিত ও সুরারোপিত কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানটিও ব্যবহার করা হয়েছিল।

চলচ্চিত্রটির নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলে। এতে অভিনয় করেছিলেন আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, ইনাম আহমেদ শাহানা (আতিয়া চৌধুরী), কায়েস, আলেয়া, সিতারা, সুপ্রিয়া, কালিপদ, আমিনুল হক বাদশা ও আরও অনেকে। চিত্রগ্রহনে ছিলেন রফিকুল বারী চৌধুরী ও আওলাদ হোসেন। ছবিটি পরিবেশনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ‘রূপবান’ খ্যাত চলচ্চিত্রকার সালাউদ্দিন – তাঁর সালাউদ্দিন চিত্রকল্পের ব্যানারে।
১৯৭০ সালের ২৫ জুন জয় বাংলা ছায়াছবির উদ্বোধন উপলক্ষে একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সেখানেই চলচ্চিত্রটির বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের সামনে উত্থাপিত হয়। পরদিন প্রায় সব পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে ‘জয় বাংলা’র খবর ছাপা হলো। নেতিবাচক সংবাদ ছাপা হয় দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায়। এই পত্রিকার লেখা ছিল ‘ছায়াছবিতে রাজনৈতিক আগ্রাসন’ জাতীয় কথা। সংবাদে জয় বাংলা চলচ্চিত্রে ছয় দফা এবং সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয় উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। ফলে চলচ্চিত্রটির শ্যুটিং সমাপ্ত করে ১৯৭০ এর জুনে সেন্সরে দেওয়া হলেও ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার চলচ্চিত্রটিকে আলোর মুখ দেখতে দেয়নি। ১৯৭০ সালের অগ্নিগর্ভ আন্দোলনের সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সনদের চলচ্চিত্র রূপকে পর্দায় প্রতিফলিত করতে দিতে পারে? চলচ্চিত্রটির প্রভাবশালী চিত্রপ্রযোজক আবুল খায়ের বহু দেন দরবার করেও চলচ্চিত্রটির সেন্সর করাতে পারেননি। সর্বশেষ ১৯৭১ এর মার্চ মাসের ২২ তারিখে ঢাকা সেনানিবাসের গ্যারিসন সিনেমা হলে ছবিটি দেখেন রাও ফরমান আলী। কিন্তু চলচ্চিত্রটির মুক্তির ব্যাপারে কোন সিধান্ত হয়নি – হবে কেমন করে – পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী যে ততক্ষনে বাঙালির স্বাধীনতার আকাংখাকে নিষ্ঠুর ভাবে দমনের সমস্ত পরিকল্পনা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় আবুল খায়ের সাহেব চলচ্চিত্রটির একটি কপি কোলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন – তিনি তখন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ‘ফিল্ম ডিভিশন’-এর দায়িত্বে – সেখানে জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়ার বাণিজ্যিক পরিবেশনের পর এই জয় বাংলা চলচ্চিত্রটিও মুক্তি দেবার কাজ এগিয়ে গিয়েছিল – তবে এর সকল প্রক্রিয়া সমাপ্তের আগেই মক্তিযুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে যায় – ফলে আর সেখানে মুক্তি দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি জয় বাংলা মুক্তি পেয়েছিল – তবে ততদিনে বাংলার মানুষের স্বাধীনতা অর্জন হয়ে যাওয়ায় আর চলচ্চিত্রটির নির্মাণ মান ততটা উন্নত না হওয়ায় তেমন ব্যবসা সফল হয়নি।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর জয় বাংলা চলচ্চিত্রটির প্রযোজক আবুল খায়ের সাহেবের জামাতা চলচ্চিত্র পরিচালক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংস্কৃতিক সম্পাদক বাদল রহমানের তত্ত্বাবধানে পুনরায় চলচ্চিত্রটির একটি পজেটিভ প্রিন্ট করা হয়। এরপর চলচ্চিত্রটির প্রারম্ভে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার একটি শুভেচ্ছা বাণী শ্যুটিং করে ও সমাপ্তে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের পুরো ভাষণ সংযুক্ত করে আবুল খায়েরের মালিকানাধীন ঢাকার কারওয়ান বাজারের ‘পুর্নিমা’ সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া হয় – এবারও তেমন দর্শকপ্রিয়তা পায়নি চলচ্চিত্রটি। আর বাদল রহমানের অবহেলায় চলচ্চিত্রটির ঐ একটি প্রিন্টও সংরক্ষিত হয়নি।
তবে চলচ্চিত্রটির জন্যে লিখিত গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আনোয়ার পারভেজ, শাহনাজ রহমতউল্ল্যাহ, আব্দুল জব্বার’দের সৃষ্টি ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি বাঙালির জনমানসে ব্যাপক ভুমিকা রাখে। চলচ্চিত্রটি মুক্তির আগেই এর পরিবেশক, চিত্রপরিচালক সালাউদ্দিনের ‘পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম কর্পোরেশন লিঃ’-এর দোয়েল মার্কা ‘ঢাকা রেকর্ড’ নামক গ্রামোফোন কোম্পানী থেকে ৭৮ আরপিএম রেকর্ডে চলচ্চিত্রটির জন্যে লিখিত একমাত্র গানটি প্রকাশ করে। প্রকাশের পরপরই মুক্তিকামী বাঙ্গালী দলে দলে কিনতে শুরু করে এই গানের রেকর্ড। এই গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমেই ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি ১৯৭০ সালেই জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
এই গানটি ১৯৭১ এর ২৪ মে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জয়ন্তীতে কোলকাতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে চালু হওয়া ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’র টিউনিং সং হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হয়ে স্বাধীনতার গানে পরিণত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় সঙ্গীত হিসেবেও গানটি দলের সব অনুষ্ঠানে বাজানো হয়। ‘জয় বাংলা’ গানের ধ্বনি বাঙালির জাতিসত্তার মূলমন্ত্র এবং আমাদের অন্তরাত্মার অনুরণন। এর ধ্বনির মাধ্যমেই প্রেথিত আছে বাংলার বাঙ্গালীর মুক্তির মুল মন্ত্র।
তথ্যসূত্র –
১) ছয় দফা আমাদের বাঁচার দাবি, শেখ মুজিবুর রহমান, ১৯৬৬।
২) আমাদের জয় বাংলা, মাহবুব তালুকদার প্রথম আলো – ২০ মার্চ, ২০১৪।
৩) চলচ্চিত্র গবেষক জনাব মীর শামছুল আলম বাবুর ফেসবুক পোস্ট।
