‘ইউনূসকে ৫ বছর ক্ষমতায় চাই’: পেজের লাইক-ফলোয়ার বাড়ানোর ধাপ্পাবাজি ফাঁস

‘ইউনূসকে ৫ বছর ক্ষমতায় চাই’: পেজের লাইক-ফলোয়ার বাড়ানোর ধাপ্পাবাজি ফাঁস
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্লোগান বেশ দৃষ্টিগোচর হয়েছে— ‘ড. ইউনূসকে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় চাই’। রাজনৈতিক আবহে গা ভাসানো এই স্লোগান প্রথম নজরে পড়লে মনে হতে পারে এটি কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগ বা আন্দোলনের অংশ। কিন্তু তথ্য যাচাইভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাব এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভিন্ন, চমকপ্রদ বাস্তবতা।

ডিসমিসল্যাব তাদের ২৯শে মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়— “তারাও ড. ইউনূসকে পাঁচ বছরের জন্য চান, শুধু ফেসবুকে লাইক বাড়াতে”।

রাজনীতি নয়, পণ্যের মার্কেটিং!

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্লোগানটি ব্যবহৃত হচ্ছে মূলত ফেসবুক পেজের লাইক ও ফলোয়ার বাড়াতে। খাবার, প্রসাধনী, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিগত ভ্লগ পরিচালনাকারী পেজগুলো এই রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহার করে জনমনোযোগ কাড়ার চেষ্টা করছে।

ডিসমিসল্যাব বিশ্লেষণে পেয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে ৪৭টি ফেসবুক পেজ কমপক্ষে ৫৫টি বিজ্ঞাপন দিয়েছে—সবগুলোতেই ছিল ঐ স্লোগান বা তার কাছাকাছি বার্তা। এসব পেজের ৯০ শতাংশ অতীতে কোনো রাজনৈতিক বিষয় পোস্ট করেনি।

সারজিস আলমের পোস্ট থেকে ভাইরাল ট্রেন্ড

এই প্রবণতার সূচনা ধরা হয় ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এর একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে। ২৯শে মার্চ তিনি লেখেন— “ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন স্টেটসম্যানকে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার আজীবন থাকবে।”

এই মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়। তা থেকেই ব্যবসায়িক পেজগুলো এই জনপ্রিয় কথাকে নিজেদের মার্কেটিং অস্ত্রে পরিণত করে।

লাইক-পলিটিক্স: ‘লাইক দিলে ইউনূস ক্ষমতায় যাবেন!’

ঢাকার একটি রেস্তোরাঁ দ্য টেস্টি অ্যাপ্রোন ১৩ ও ১৪ মে দুটি বিজ্ঞাপন প্রচার করে। বিজ্ঞাপনের বার্তা ছিল— “আপনি যদি চান ড. ইউনূস পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকুক, তাহলে ডান পাশে লাইক অপশনে ক্লিক করুন।”

এই বার্তার নিচে যুক্ত করা হয় ফেসবুকের লাইক বাটন। তবে পেজের বাকি পোস্টগুলোতে কোনো রাজনৈতিক বার্তা নেই—পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এসব ছিল সাধারণ খাদ্যপণ্যের ছবি, অফার, এবং রেসিপি ভিডিও।

কারা দিচ্ছে এসব বিজ্ঞাপন?

ডিসমিসল্যাব জানায়:

  • ৩০টি পেজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—খাবার, কসমেটিকস, মৌসুমি ফল।
  • ৮টি পেজ ব্যক্তিগত ব্লগ বা ভ্লগ।
  • ২টি মিডিয়া পেজ।
  • বাকিগুলো ডিজিটাল মার্কেটিং বা ‘পাবলিক ফিগার’ হিসেবে তালিকাভুক্ত।

এদের মধ্যে ২৪টি পেজ পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে, একটি ইতালি থেকে এবং আরেকটি যৌথভাবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

বিজ্ঞাপনদাতাদের ভাষ্য: ‘আমরা তো শুধু ফলোয়ার বাড়াতে চেয়েছিলাম’

ডিসমিসল্যাব ছয়জন পেজ অ্যাডমিনের সঙ্গে কথা বলেছে।

  • চারজন জানান, তারা নিজেরা বিজ্ঞাপন তৈরি করেননি—একটি ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
  • একজন খোলাখুলি স্বীকার করেছেন— “আমি নিজেই বিজ্ঞাপন বানিয়েছি, কারণ লাইক বাড়ানো দরকার ছিল।”
  • আরেকজন বলেন, “বিষয়বস্তু কী হবে সেটা মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করেছে, আমরা শুধু বলেছিলাম ফলোয়ার বাড়াতে।”

‘ইয়াতি ডিজিটাল’ নামের একটি ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানের সিইও এ এম ফারুক জানান, “এই ধরনের কনটেন্টের মূল লক্ষ্যই পেজের ফলোয়ার বাড়ানো। এখনকার অনেকেই পেজের মান নির্ধারণ করেন ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে।”

মেটার নিয়ম লঙ্ঘন: স্লোগান রাজনৈতিক, কিন্তু বিজ্ঞাপন ‘নির্দোষ’ সাজানো

মেটা (ফেসবুকের মালিক) এর নীতিমালা অনুযায়ী—রাজনৈতিক, নির্বাচনসংক্রান্ত বা সামাজিক ইস্যুভিত্তিক যেকোনো বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছতার ঘোষণা (ডিসক্লেইমার) থাকা বাধ্যতামূলক। বিজ্ঞাপনদাতার পরিচয় ও তা যাচাইয়ের তথ্য থাকতে হবে। কিন্তু ডিসমিসল্যাব বলছে—পর্যালোচিত ৫৫টি বিজ্ঞাপনের একটিতেও কোনো ডিসক্লেইমার ছিল না।

ফলে:

  • ১২টি বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলে মেটা।
  • বাকি ৪৩টি বিজ্ঞাপন তখনও সক্রিয় ছিল।

এছাড়া, মেটা এখনো বাংলা ভাষায় লেখা রাজনৈতিক কনটেন্ট শনাক্ত করতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।

রাজনীতির মোড়কে মার্কেটিংয়ের ধান্দা

‘ড. ইউনূসকে ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় চাই’—শ্লোগানটি আপাতদৃষ্টিতে একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা হলেও বাস্তবে এটি হয়ে উঠেছে একটি ক্লিক-বাণিজ্যের হাতিয়ার। অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে—রাজনৈতিক বার্তাকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে ক্লিক ও ফলো দিতে, যা তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালার মারাত্মক লঙ্ঘন।

Visited 169 times, 1 visit(s) today