মতামত।। শেখ হাসিনার নেতৃত্বঃ উন্নয়নমূলক গণতন্ত্র না ফ্যাসিবাদ?

মতামত।। শেখ হাসিনার নেতৃত্বঃ উন্নয়নমূলক গণতন্ত্র না ফ্যাসিবাদ?
শেয়ার করুন

(ফ্যাসিবাদ বিষয়ে আলি শরিয়তির বাস্তবতা, যুক্তি ও উদাহরণভিত্তিক বিশ্লেষণ)

“ফ্যাসিবাদ” শব্দটি অনেক সময় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, বরং এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী ধারণা। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচকরা, বিশেষ করে বিরোধী দলগুলো, তাঁর শাসনামলকে (২০০৯-২০২৪) ফ্যাসিবাদী বলে অভিহিত করেছেন। তবে, তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক (প্রায়োগিক) বিশ্লেষণের আলোকে এই অভিযোগের পক্ষে কথা বলার কোনো যুক্তি নেই । ঐতিহাসিকভাবে, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা যেমন, মুসোলিনির ইতালি, হিটলারের জার্মানি এবং ফ্রাঙ্কোর স্পেন, কঠোর জাতীয়তাবাদ, সামরিকীকরণ, নাগরিক স্বাধীনতার দমন, এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কেন্দ্রীয়করণের উপর ভিত্তি করে গঠিত।

শেখ হাসিনার শাসন, যদিও রাজনৈতিক আধিপত্যের অভিযোগ রয়েছে, মূলত অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠানগত উন্নয়ন, এবং আঞ্চলিক কূটনীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। তাঁর নেতৃত্ব উন্নয়নমূলক গণতন্ত্র (developmental democracy) এবং প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার (competitive authoritarianism) সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে নয়। ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর বিশ্লেষণ করে আমরা দেখাবো যে, শেখ হাসিনার শাসন ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সাথে মেলে না, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদী ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং তাঁর শাসনকাল চিহ্নিত হয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি এবং একটি জটিল গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে। বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাবো ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনকাল ও নেতৃত্ব মূলত উন্নয়নমূলক গণতন্ত্র, এটাকে কোনো তত্ত্ব মতেই ফ্যাসিবাদী শাসন হিসেবে মূল্যায়নের ন্যূনতম সুযোগ নেই।

ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ

শেখ হাসিনার শাসন ফ্যাসিবাদী কি না তা মূল্যায়ন করতে হলে, প্রথমে ফ্যাসিবাদের একাডেমিক সংজ্ঞা বুঝতে হবে। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ রবার্ট প্যাক্সটন (২০০৪) এবং ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ রজার গ্রিফিন (১৯৯১) ফ্যাসিবাদকে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত করেছেন:

১. চরম জাতীয়তাবাদ ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব- ফ্যাসিবাদী সরকারগুলো জাতিগত বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রচার করে এবং আক্রমণাত্মক সম্প্রসারণবাদ নীতির মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করে।

২. একদলীয় শাসন ও বিরোধী দল দমন – ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নির্মূল করে এবং প্রায়শই সহিংস উপায়ে বিরোধী দল দমন করে।

৩. সামরিকীকরণ ও যুদ্ধকেন্দ্রিক নীতি – ফ্যাসিবাদী দেশসমূহ যুদ্ধ এবং সামরিক সম্প্রসারণকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

৪. অর্থনৈতিক কর্পোরেটিজম ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি – রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একীভূতকরণ করে শ্রমিক আন্দোলন এবং নাগরিক সমাজ দমন করা হয়।

৫. ব্যক্তিপূজা ও নিঃশর্ত আনুগত্য – ফ্যাসিবাদী নেতা সাধারণত নিজেকে জাতির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং সম্পূর্ণ আনুগত্য দাবি করেন।

শেখ হাসিনার শাসনামলে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের অনুপস্থিতিঃ

১. রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং বিরোধী দলের উপস্থিতি

ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিরোধী রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা, যা সাধারণত সহিংস দমন, জবরদস্তি বা সরাসরি নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বহুদলীয় গণতন্ত্র বজায় রেখেছে, যেখানে নিয়মিত নির্বাচন, সক্রিয় বিরোধী দল (যদিও দমনমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে), এবং কার্যকরী নাগরিক সমাজ রয়েছে।

বিরোধী দল, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াত-ই-ইসলামী, আইনগত এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও, তাদের অস্তিত্ব এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা ফ্যাসিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সাংঘর্ষিক। ফ্যাসিবাদী শাসনে যেমন মুসোলিনি ও হিটলারের শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, ভিন্নমতাবলম্বীদের বন্দি শিবিরে পাঠানো হয়েছিল এবং স্বাধীন গণমাধ্যমকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ছিল, ৮০+ টিভি চ্যানেল ও ৩০০+ পত্রিকা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যেখানে সরকারের সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে, এবং বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন সময় সভা সমাবেশ করেছে এবং সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে।

এছাড়া, বিএনপির নির্বাচন বর্জনের কৌশল এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা—যা মূলত তাদের তৃণমূল পর্যায়ে সমর্থন সংগঠিত করতে ব্যর্থতা থেকে এসেছে, সরকার কর্তৃক দমন নীতির কারণে নয়। এটিকে ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে গণতন্ত্র ধ্বংসের সাথে তুলনা করা যায় না। বিরোধী দলের কৌশলগত ব্যর্থতা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা কখনোই একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নিধনের সমতুল্য নয়।
আমরা বরং দেখি, শেখ হাসিনার শাসনামলে একাধিক নতুন রাজনৈতিক দল ও জোট গঠিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে:

• জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট (Jatiya Oikya Front): অক্টোবর ২০১৮ সালে গঠিত এই জোটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (JSD), এবং নাগরিক ঐক্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলা।

• গণ অধিকার পরিষদ (Gono Odhikar Parishad): অক্টোবর ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি ছাত্র আন্দোলনের ভিত্তিতে গঠিত হয়, যা গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে সক্রিয়। এর উত্থান বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের গতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার প্রতিফলন।

• ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ (Humanity Revolution Bangladesh): জানুয়ারি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং মে ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত এই দলটি মানবিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে।

এই নতুন রাজনৈতিক দল ও জোটের গঠন এবং কার্যক্রম স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বহুত্ববাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে, যা ফ্যাসিবাদী একদলীয় শাসনের ধারণার বিপরীত।

২. ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতিগত-ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের অনুপস্থিতি

ফ্যাসিবাদ সাধারণত চরম জাতীয়তাবাদ, জাতিগত বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি দ্বারা চিহ্নিত হয়। হিটলারের জাতিগত নিধন অভিযান থেকে শুরু করে মুসোলিনির জাতীয়তাবাদী নীতি পর্যন্ত, ক্লাসিক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাগুলো জাতীয় পরিচয় সংহত করার জন্য জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর উপর দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার সম্পূর্ণ বিপরীত নীতি অনুসরণ করেছে, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বহুত্ববাদকে শক্তিশালী করা হয়েছে।

• ধর্মীয় উগ্রবাদ দমন: তাঁর প্রশাসন হেফাজতে ইসলাম এবং জামায়াত-ই-ইসলামী-র মতো ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনগুলোর প্রভাব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, যা বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছে।

• রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি: ফ্যাসিবাদী সরকারগুলো সাধারণত জাতিগত সংখ্যালঘুদের (বহিষ্কার) বা নির্মূলকরণে বিশ্বাসী। কিন্তু শেখ হাসিনা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে।

• ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা: তাঁর সরকার হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে, যা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জাতিগত নির্দিষ্টতা নির্ভর নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

এই সমস্ত পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চরম জাতীয়তাবাদী বা ধর্মীয়ভাবে বিভাজন সৃষ্টিকারী নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, এবং মানবিক নেতৃত্বের উদাহরণ।

৩. অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন বনাম কর্পোরেট রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রগুলো সাধারণত কর্পোরেট অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করে, যেখানে সরকার বড় শিল্পগুলোর সঙ্গে একীভূত হয়ে ক্ষমতা সুসংহত করে, শ্রমিক আন্দোলন দমন করে এবং অর্থনীতিকে সামরিকীকরণের দিকে পরিচালিত করে।
শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক নীতি ছিল বাজারভিত্তিক এবং উন্নয়নকেন্দ্রিক, যা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক মডেলের পরিবর্তে উন্নয়নমূলক গণতন্ত্রের (Developmental Democracy) সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশ নিম্নলিখিত অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে:

• নিয়মিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি: বাংলাদেশ গড়ে ৬-৭% বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে, যা দেশকে নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করেছে। (বিশ্বব্যাংক, ২০২৩)

• অবকাঠামোগত উন্নয়ন: পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রমাণ করে যে তাঁর লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক আধিপত্য নয়।

• দারিদ্র্য হ্রাস: দারিদ্র্যের হার ২০০৯ সালে ৩১.৫% থেকে ২০২৩ সালে ১৮.৭%-এ নেমে এসেছে (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০২৩)। এছাড়াও, প্রতি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফলন।

এছাড়া, বাংলাদেশের বেসরকারি খাত ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে, বিশেষ করে রেডিমেড গার্মেন্টস (RMG) শিল্প, যা ২০১০ সালে ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালে ৪৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে (বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২৩)।

ফ্যাসিবাদী অর্থনীতিতে রাষ্ট্র শিল্পের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রতিযোগিতাকে দমন করে। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার ব্যক্তিখাতের বিকাশ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতিকে উৎসাহিত করেছে, যা ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর বিপরীত।

৪. সামরিকীকরণের অনুপস্থিতি এবং সম্প্রসারণবাদী নীতির পরিত্যাগ

ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা সাধারণত সামরিক সম্প্রসারণবাদ এবং যুদ্ধের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। মুসোলিনির ইতালি আফ্রিকা দখলের চেষ্টা করেছিল, হিটলারের জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল, এবং জাপানের ফ্যাসিবাদী নেতৃত্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়েছিল।

কিন্তু শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণ বিপরীত পথ অনুসরণ করেছে, যা সামরিকীকরণ নয়, বরং কূটনীতি, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে গঠিত। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশ নিম্নলিখিত কৌশল গ্রহণ করেছে:

• আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার: বাংলাদেশ ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করেছে কিন্তু কখনোই সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি বা আগ্রাসী অবস্থান নেয়নি।

• শান্তিপূর্ণ সীমান্ত বিরোধের সমাধান: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি করেছে, যা যুদ্ধ বা সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই কূটনৈতিক সমাধানের নিদর্শন।

• সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা: শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ কোনো সামরিক আগ্রাসনে লিপ্ত হয়নি বা প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেনি, যা ফ্যাসিবাদী সম্প্রসারণবাদী নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

শেখ হাসিনার অসামরিকীকরণ নীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় প্রতিশ্রুতি, এবং শান্তি-ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তাঁর শাসন সামরিক আধিপত্যবাদী বা ফ্যাসিবাদী যুদ্ধনীতি অনুসরণ করেনি।

৫. প্রাতিষ্ঠানিক শাসন ব্যবস্থা, স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কত্ব নয়

ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় একজন সর্বময় ক্ষমতাধর নেতা থাকেন, যার ক্ষমতা কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলতে থাকে। সাধারণত, এসব শাসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয় বা ব্যক্তিগত শাসনের অধীনে নিয়ে আসা হয়। তবে, শেখ হাসিনা যদিও একজন শক্তিশালী নেতা, তিনি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক একনায়কত্বে রূপান্তর করেননি।

• বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং সংসদ কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়েছে, যদিও নির্বাহী ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতার এই প্রভাব ব্যাক্তিকেন্দ্রিক নয়, সংসদীয় কিংবা রাষ্ট্রপতি শাসিত অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাহী প্রধানকে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখা যায়।

• গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় ছিল, যদিও কখনো কখনো সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে। অনেক নতুন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং বাধাহীনভাবে শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচনা করেছে।

• স্বাধীন ব্যবসায়িক খাত এবং নাগরিক সমাজ সক্রিয় ছিল, যা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কঠোর স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণের বিপরীত।

যদিও গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে, এটি মোটেই সম্পূর্ণ দমনমূলক বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো নয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে বিরোধী কণ্ঠস্বর প্রবলভাবে শোনা গেছে ।
সুতরাং এটি প্রমাণ করে যে, শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করছে।

উপসংহার: উন্নয়নমূলক গণতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ নয়

শক্তিশালী নেতৃত্বের অর্থ ফ্যাসিবাদ নয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে শক্তিশালী নেতৃত্ব ছিল, কিন্তু এটি ফ্যাসিবাদের মূল নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং, তাঁর শাসন অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন, আঞ্চলিক কূটনীতি, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তবতা বিবেচনা না করে শুধুমাত্র ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের ধারণার আলোকে তাঁর শাসনকে বিশ্লেষণ করা বিভ্রান্তিকর হবে।

‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি প্রায়শই রাজনৈতিক বিতর্কে নেতাদের বৈধতা খর্ব করার জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে শেখ হাসিনার শাসন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর নেতৃত্বকে উন্নয়নমূলক গণতন্ত্রের (Developmental Democracy) অধীনে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়, যেখানে রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই বজায় থাকে।
সুতরাং, শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী আখ্যা দেওয়া তাত্ত্বিক ও বাস্তবিকভাবে ভিত্তিহীন। বরং, তাঁর শাসনামলের মূল্যায়ন হওয়া উচিত বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিবর্তন এবং তাঁর নেতৃত্বে অর্জিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোকে।

References:
Paxton, Robert O., Ernst Jünger, Benito Mussolini, and Art Spiegelman. “What is Fascism.” The Anatomy of Fascism (New York: Alfred A. Knopf, 2004) (2004).
Griffin, Roger. The nature of fascism. Routledge, 2013.

 

লেখকঃ
আলিশরিয়তি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Visited 457 times, 1 visit(s) today