নিজস্ব প্রতিবেদক | ১০ই মে, ২০২৫
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি তুলে শাহবাগে অবস্থান নেওয়া কথিত ছাত্র-জনতার সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন নিষিদ্ধঘোষিত শীর্ষ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান জসীমউদ্দীন রাহমানী। বিশ্বের ভয়ঙ্করতম জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার বাংলাদেশি অনুসারী সংগঠন এবিটি।
শুক্রবার বিকেলে শাহবাগে গিয়ে এই ভয়ঙ্কর জঙ্গি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। তার উপস্থিতি এবং আন্দোলনে জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দা এবং সমালোচনা করছেন নেটিজেনরা।
ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এই জসীমউদ্দীন রাহমানী গত ২৭শে আগস্ট মুক্তি পান। ৫ই আগস্টের পর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে তিনি ছাড়া পান।
শুধু রাজীব হায়দারই নয়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয়, নিলয় নীলসহ বহু ব্লগার ও লেখককে জসীমউদ্দীন রাহমানীর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে খুন করে জঙ্গিরা।

এর আগে, এই ভয়ঙ্কর জঙ্গি কারামুক্ত হবার পর নানা সমালোচনা হয়েছিলো এমনকি ৫ই আগস্টের পর থেকে একের পর শীর্ষ জঙ্গিকে মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে দেশ বিদেশে ইউনূস সরকার ভয়াবহ সমালোচনার মুখেও পড়েছিল। ‘বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থার উত্থান’ শিরোনামে নিউইয়র্ক টাইমসও রিপোর্ট করেছে। কিন্তু ইউটিউব সরকার এ ব্যাপারে নিশ্চুপ, কারণ তাদের হাত ধরেই শীর্ষ জঙ্গিনেতারা একে একে বেরিয়ে আসছে।
ফেসবুকে আরিফ মাহমুদ নামে একজন লিখেন, রাহমানীর জেল থেকে বের হওয়ার ফলাফল আমাদের চোখের সামনেই, পুলিশকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরিও মিছিল করছে ঢাকায়। সামনে আরো অনেক কিছু দেখতে হবে বাংলাদেশকে।

রুবেল হায়দার নামে একজন মন্তুব্য করেছেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের নামে কারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে তা আর বোঝার অপেক্ষা রাখে না। রাহমানীর মতো জঙ্গিরা যখন রাস্তায় নামে আন্দোলনের নামে, তখন দেশ যে আর আফগানিস্তান হতে বেশি দূরে নয়, সে বিষয় স্পষ্টই বোঝা যায়।
তবে রাহমানীর উপস্থিতির বিষয় নিয়ে জানতে এনসিপির অন্যতম নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিসের নাম্বারে ফোন দিলেও তারা কল রিসভ করেননি।
গত বছরের অক্টোবরে ইউটিউবে প্রকাশিত এক ওয়াজ মাহফিলের ভিডিওতে জসীমউদ্দীন রাহমানীকে ঢাকার কয়েকটি গণমাধ্যমের সমালোচনা করতে শোনা যায়। সেসময় একটি লাইভ শোতে দেখা গেছে দেশ ছেড়ে পলাতক পিনাকী ভট্টাচার্য, প্রতারণা ও পর্নোগ্রাফির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দুই পলাতক ইউটিউবার- ইলিয়াস হোসেন ও কনক সরওয়ার, বিএনপি-জামায়াত আমলে র্যাবের ক্রসফায়ার এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করা ও জঙ্গিবাদে মদদের অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হাসিনুর রহমান এবিটি প্রধান জসীমউদ্দীন রাহমানীর সাথে বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বৈঠক আয়োজিত হয়।

কে এই জসীমউদ্দীন রাহমানী?
২০১৩ সালের আগস্টে বরগুনা শহরের উপকণ্ঠে দক্ষিণ খাজুরতলা এলাকার জলিল মাস্টারের বাড়ি থেকে গোপন বৈঠক চলাকালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীসহ ৩১ জঙ্গীকে আটক করে গোয়েন্দা দল। পরদিন তার ঢাকার বছিলার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে অসংখ্য জিহাদি বই ও জঙ্গি প্রশিক্ষণের শতাধিক সিডি উদ্ধার করে পুলিশ।
বছিলায় মারকাজুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার নীচতলায় মসজিদ। পাশে টিনশেডে জসীমউদ্দীনের অফিস, পরিবার নিয়ে থাকার ঘর, কম্পিউটার কক্ষ, লাইব্রেরিসহ ৮টি কক্ষ রয়েছে। বরগুনায় তাকে আটকের খবর শুনে ঢাকায় দ্রুত কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরিয়ে ফেলে তার অনুসারীরা।
জসীমউদ্দীন বরগুনা সদর উপজেলার দক্ষিণ হেউলিবুনিয়া গ্রামের মৃত নূর হাওলাদারের ছেলে। ৫ ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ জসীম উদ্দিন বরগুনা শহরের ইসলামিয়া হাফেজি মাদ্রাসা থেকে হাফেজি পাস করে ঢাকার মোহাম্মদপুরে শায়খুল হাদিস আজিজুল হক প্রতিষ্ঠিত জামেয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৯০ সালে প্রথম দাওরা (মাওলানা) পাস করে ভারতের দেওবন্দে পড়াশোনা করেন। পরে হায়দ্রাবাদের সাবেলুস সালাম মাদ্রাসা থেকে মুফতি (ফিকাহ শাস্ত্রে) পাস করেন।
এরপর ঢাকার জামেয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসা ও বরিশালের মাহমুদিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ২০০৪ সালে তিনি বরগুনা কেন্দ্রীয় সদরঘাট জামে মসজিদে প্রধান খতিব হিসেবেও চাকরি করেন। পরে তিনি সৌদি আরবের মদিনায় লিসানস বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর দেশে ফিরে প্রথমে ধানমন্ডির হাতেমবাগ মসজিদের খতিব ও পরে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় মারকাজুল উলুম আল ইসলামিয়া নামে একটি মাদ্রাসা ও একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সেই মাদ্রাসার পরিচালক হন।

এই মাদ্রাসা ও মসজিদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওয়াজ, জুমার নামাজের খুতবা, পুস্তিকা ছাপিয়ে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্র মতবাদ প্রচার এবং তরুণদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। একই সঙ্গে তিনি গোপন জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে আসছিলেন।
জসীমউদ্দীন রাহমানী ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী রাজীব হায়দার হত্যা মামলায় ৫ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সিকিউরিটি আইনে দায়ের আরও ৫টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার মধ্যে একটিতে তার সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে। অন্য ৫টি মামলায় তাকে জামিন দেখিয়ে কারগাার থেকে বের করে আনে তার অনুসারীরা।
২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে বাসার সামনে ব্লগার রাজীবকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই মামলায় ২০১৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর রায়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ২ জঙ্গিকে ফাঁসি, ৪ জনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড, একজনকে ৩ বছরের এবং জসীমুদ্দীন রাহমানীকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন নিম্ন আদালত। রাজীব হত্যায় উস্কানিদাতা হিসেবে রাহমানীর সাজা হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতেও ওই সাজা বহাল থাকে।
