মতামত।। ইউনুস সরকারের জন্য গণহত্যা ও নুরেমবার্গ ট্রায়াল সম্পর্কিত যে বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন

মতামত।।  ইউনুস সরকারের জন্য গণহত্যা ও নুরেমবার্গ ট্রায়াল সম্পর্কিত যে বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন
শেয়ার করুন

আরিফ ইশতিয়াক রাহুল

ইদানীং একটা উদাহরণ খুব শোনা যায়। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের উদাহরণ। নুরেমবার্গ ট্রায়াল সম্পর্কে যারা দশ লাইনও বলতে পারবে না তারাও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার জন্য নুরেমবার্গ ট্রায়ালের উদাহরণ দেয়। চলুন, নুরেমবার্গ ট্রায়াল সম্পর্কে কিছু সাধারণ তথ্য জেনে নিই।
১. নাৎসি শাসনামলে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি ও লক্ষাধিক রোমা, প্রতিবন্ধী ও সমকামী হত্যা, আগ্রাসী যুদ্ধ পরিচালনা এবং যুদ্ধবন্দীদের উপর নির্যাতনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত বিচার প্রক্রিয়াকে নুরেমবার্গ ট্রায়াল বলা হয়।
২. নুরেমবার্গ ট্রায়ালে মোট ২৪ জন নাৎসি নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়। যেখানে ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও ৩ জনকে খালাস দেওয়া হয়। একজন রায়ের আগেই আত্মহত্যা করেন।
৩. অভিযুক্ত ২৪ জনের মধ্যে একজন, গুস্তাভ ক্রুপ, স্বাস্থ্যগত কারণে বিচারের অযোগ্য ঘোষিত হন।
৪. অভিযুক্তদের পক্ষে জার্মান আইনজীবী দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা নিজেদের পক্ষে সাফাই গাইতে পারতেন।
৫. আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইবুনাল, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল, ইউনেস্কো, ইন্টারন্যাশনাল হলোকাস্ট রিমেমব্রেন্স অ্যালায়েন্স, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে।
এইবার আসেন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। কিছু প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজি।
১. বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে?
২. ইউনুসের আদালতে অভিযুক্ত ঠিক কতজন?
৩. ইউনুস যেটাকে গণহত্যা বলে সেটাকে ইউনুসের আজ্ঞাবহ আদালত ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক আদালত বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে?
বাংলাদেশে জুলাইয়ে একটি সহিংস আন্দোলন হয়েছে, কোনো যুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ হয় নি। কিন্তু ইউনুসের অপপ্রচার বাহিনী এটাকে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে বড় করতে করতে প্রায় বিশ্বযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
রাষ্ট্রের মধ্যে সংগঠিত কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে যে কেউ থাকতে পারে। এটা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু ইউনুসের সন্ত্রাসী বাহিনী এটাকে অতিরঞ্জিত করে এভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে — যারা এই আন্দোলনের বিপক্ষে ছিলো তারা বিশ্বযুদ্ধের মতো অপরাধ করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা ইতোমধ্যে এমন এক বিচারিক কাঠামো তৈরি করেছে যা নুরেমবার্গ ট্রায়ালকেও বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
৬০ লক্ষ হত্যার বিচারের জন্য গঠিত নুরেমবার্গ ট্রায়ালে অভিযুক্ত ছিলো ২৪ জন। আর ৮০০ জন (যদিও এই সংখ্যা ও হত্যা নিয়েও বিতর্ক আছে) হত্যার বিচারে অভিযুক্ত প্রায় ৩-৪ কোটি মানুষ। ইতোমধ্যে ৬০-৭০ হাজার আটকও করেছে।
যদিও Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide, 1948 দ্বারা নির্ধারিত সংজ্ঞানুসারে এটি গণহত্যার মধ্যে পড়েই না, কিন্তু বিচার করছে গণহত্যার। আন্তর্জাতিক আদালত বা কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এটাকে গণহত্যার স্বীকৃতি না দিলেও ইউনুসের সার্টিফিকেট হলো — একাত্তরের গণহত্যার সহযোগী জামাত ও জামাতি ফেক আইডিগুলো এটাকে গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে।
নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নাৎসি পার্টির সাথে যুক্ত চিকিৎসক, অভিনেতা, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক ও ক্রিকেটারদের গণহত্যায় অভিযুক্ত করা হয় নি৷ সবাইকে গণহত্যার সহযোগী বানানো হয় নি। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে তাদেরই অভিযুক্ত করা হয়েছিলো যারা সত্যিকারের অপরাধী।
৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যার দায়ে অভিযুক্তদের ওপরেও আদালতে মব হয় নি। তাদের আইনজীবীরা আদালতে মারধরের শিকার হয় নি, উল্টো তাদের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে আইনজীবী দেওয়া হয়েছিলো। তারা আদালতে আত্মপক্ষে সাফাই গাইতে পারতো। ইউনুসের আদালতে সেই সুযোগও দেওয়া হয় না, আসামী কথা বলতে গেলেই রাষ্ট্রপক্ষ বাঁধা প্রদান করে।
নুরেমবার্গ ট্রায়ালে অভিযুক্ত গুস্তাভ ক্রুপকে স্বাস্থ্যগত কারণে বিচারের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিলো। যেখানে ইউনুসের বাহিনী কারাবন্দী আসামীর ওপরে হাসপাতালেও হামলা চালায়। পুলিশ প্রহরায় আদালতে হামলা হয়। একেরপর এক রাজবন্দীদের কারাগারে হত্যা করা হচ্ছে। ৮৫ বছর বয়সী আমির হোসেন আমুকে পিঠমোড়া করে নিয়ে যাচ্ছে। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে এসব হয় নি। নুরেমবার্গ ট্রায়াল ৬০ লক্ষ হত্যার দায়ে অভিযুক্তদেরও মানবাধিকার নিশ্চিত করেছিলো, যা ইউনুস কেড়ে নিয়েছে।
কিছু কিছু ভদ্রলোক বলে থাকে, এগুলো জনরোষের কারণে হচ্ছে, তাদের কাছে জিজ্ঞাসা, একটা বিশ্বযুদ্ধ ও ৬০ লক্ষ হত্যার চেয়েও বেশি জনরোষ আপনাদের?
সবশেষে বলতে চাই, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের জন্য যারা নুরেমবার্গ ট্রায়ালের উদাহরণ দেয় তারা যেনো নুরেমবার্গ ট্রায়াল সম্পর্কে ভালোভাবে পড়াশোনা করে। ইউনুস যদি সত্যিকার অর্থে নুরেমবার্গ ট্রায়ালও তৈরি করতে পারতো তাহলে একটা আন্দোলনকে বিশ্বযুদ্ধ বানাতে হতো না, বিচার বিচারের মতোই চলতো। কিন্তু যেটা হচ্ছে সেটা নুরেমবার্গ ট্রায়ালের চেয়েও অনেক বেশি আগ্রাসী, সহিংস ও দমনমূলক।
Visited 123 times, 1 visit(s) today