preset71
৫ ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৬। লাহোরে পাকিস্তানের সব বিরোধী দলের সম্মেলন। ভারত-পাকিস্তান অমীমাংসিত যুদ্ধ শেষে জানুয়ারী মাসে তাসখন্দে শান্তিচুক্তি করে পশ্চিম পাকিস্তানে জনরোষে সম্মুখীন হয় আইয়ুব খান। পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলো এই সুযোগে সম্মিলিত মোর্চা গঠন করে আইয়ু্বকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। এরই প্রস্তুতি হিসেবে করাচীর সভা। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও এই সভায় আমন্ত্রিত। ৪ ফেব্রুয়ারী লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর আগে ঢাকায় তিনি ঘোষণা করেন, এবার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করবেন।
“স্বায়ত্তশাসন” পাকিস্তান সৃষ্টির সময় থেকেই একটি আলোচিত দাবি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী স্বায়ত্তশাসনের দাবী তুলে পশ্চিম পাকিস্তানকে একেবারে ‘ওয়ালাইকুম-আস-সালাম’ জানিয়ে দিয়েছিলেন। এর পরের বছর আইয়ুব খানের সামরিক শাসন শুরু হলে সব শুনসান। ১৯৬৩ সালে চীন সফরের পর থেকে ভাসানীর নীতি হয়ে যায়– ‘নো ডিস্টার্ব আইয়ুব’।
এই অবস্থায় সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু শেখ মুজিবকে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। আওয়ামীলীগের প্রাচীনপন্থী নেতাদের অজ্ঞাতে কয়েকজন বিশ্বস্ত বাঙালী অর্থনীতিবিদ, বাঙালী ব্যুরোক্রেট ও আইনজীবিকে সংযুক্ত করে কঠোর গোপনীয়তায় তিনি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের একটি রূপকল্প তৈরি করেন এবং এটি নিয়েই লাহোর যান। সঙ্গে ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ, আব্দুল মালেক উকিল, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, এবিএম নুরুল ইসলাম, মোঃ ইউসুফ আলী প্রমুখ।
সম্মেলনে উপস্থিত অন্য রাজনীতিবিদদের চিন্তা একটাই ছিল, আইয়ুবকে হটিয়ে নিজেদের ক্ষমতারোহণ। স্বায়ত্তশাসন বা জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম তাদের লক্ষ্য ছিলনা। তাই শেখ মুজিব তাঁর স্বায়ত্তশাসনের রূপকল্প ‘ছয়দফা’ উত্থাপনের সাথে সাথেই লোভী রাজনীতিবিদরা আঁতকে উঠেন। তাঁরা ছয়দফাকে বিবেচনায় নিতে বা আলোচনা করতেই অসম্মতি জানান। ফলে আওয়ামীলীগ এই সম্মেলনের সাথে সম্পর্কছেদ করে বেরিয়ে আসে। ১১ ফেব্রুয়ারী লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের সামনে ছয়দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। ঐদিনই শেখ মুজিব ঢাকা ফিরে আসেন।
ছয়দফার প্রথমেই একটি ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর দাবি করা হলেও পরের দফাগুলো ফেডারেশনের বদলে শিথিল কনফেডারেশনের রূপরেখা নির্দেশ করে। দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি ছাড়া কেন্দ্রের হাতে আর কিছু থাকবেনা। বাকি সব সিদ্ধান্ত প্রদেশগুলোর নিজস্ব। নিজস্ব মুদ্রা থাকবে, কর আদায়ের নিজস্ব ক্ষমতা, প্রদেশগুলো সরাসরি বৈদেশিক বানিজ্য পরিচালনা করবে, বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ প্রদেশগুলো নিজেরা গ্রহণ করবে এবং প্রদেশগুলোর নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের ক্ষমতা থাকবে। এ যেন কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ন্যূনতম সংযোগ রক্ষার চুক্তি।
পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে পারছিল– ছয়দফা মূলতঃ স্বাধীনতার দাবি। কিন্তু এর ভাষা ও বাক্যবিন্যাস এতো সুসংহত যে সরাসরি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ এর অভিযোগ তুলে আইনী ব্যবস্থাগ্রহণেরও সুযোগ নেই। ছয়দফা পেশের সময় শেখ মুজিব অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও রুহুল কুদ্দুসকে ডেকে বলেন– ‘আসলে এটা ছয়দফা নয়। এক দফাই। একটু ঘুরিয়ে বললাম।’
১১ ফেব্রুয়ারী ছয়দফা দাবি জনসম্মুখে আসার পর ১৩ ফেব্রুয়ারী প্রথম এর সমর্থনে বিবৃতি দেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের এম এ আজিজ, আব্দুল্লাহ আল হারুন, এম এ হান্নান। ১৪ ফেব্রুয়ারী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি বিবৃতি দিয়ে সমর্থন জানায়। এরপরই ছয়দফা নিয়ে ঝড় শুরু হয়। প্রথম সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করে ১৫ ফেব্রুয়ারী বিবৃতি দেয় জামায়াতে ইসলামী ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ। ২৫ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভা করে শেখ মুজিবুর রহমান ছয়দফার পক্ষে জনমত গঠনের কর্মসূচী শুরু করেন। ১৪ মার্চ সিলেটে জনসভায় তিনি ছয়দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায় করেন। উল্লেখ্য, এটি তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের কর্মসূচী নয়।
১৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চট্টগ্রামের স্টেডিয়ামের সভায় বিষোদ্গার করে বলেন– পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্টকারী এই কর্মসূচী বরদাশত করা যাবেনা। ১৮ মার্চ কনভেনশন মুসলিম লীগের কাউন্সিলে তিনি গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের মোকাবেলার আহ্বান জানান।
১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামীলীগের প্রাদেশিক সম্মেলন। প্রাচীনপন্থীদের বিরোধীতা সত্ত্বেও বেশীরভাগ জেলা নেতৃত্ব ও ছাত্রলীগের দৃঢ়তায় “ছয়দফা” আওয়ামীলীগের কর্মসূচী হিসেবে গৃহীত হয়। এই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে ছয়দফাপন্থীদের অবস্থান সুসংহত হয়। এর আগে ১৫মার্চ করাচী আওয়ামীলীগও সমর্থন জানায়।
৭ এপ্রিল মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন– তিনি ছয়দফা মানেন না, কারণ এতে শোষণ মুক্তির কোন দাবি নেই। ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের নেতারা ছয়দফাকে সিআইএ’র দলিল বলেও সমালোচনা করেন। কেউ কেউ এটিকে বিরোধী দলের ঐক্য বিনষ্টের জন্য আইয়ুব খানের সচিব আলতাফ গওহরের পরিকল্পনা বলেও অভিযুক্ত করেন। ১৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ভাসানী আবারও ছয়দফার বিরোধীতা করে বলেন– ‘স্বায়ত্তশাসন মানে বিচ্ছিন্নতা নয়। প্রয়োজনে আমি শেষ রক্তবিন্ধু দিয়ে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করব। ছয়দফা আগেও সমর্থন করিনি, এখনো করিনা।’
পাকিস্তান সরকার, ডানপন্থী ও বামপন্থী সকল রাজনৈতিক দলের বিরোধীতা অগ্রাহ্য করে শেখ মুজিব সিদ্ধান্ত নেন– সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে ছয়দফার ব্যাখ্যা প্রদান করবেন, পাকিস্তানী শোষণের চিত্র তুলে ধরবেন। এই লক্ষ্যে শুরু হয় তাঁর জেলা শহরগুলোতে গণসংযোগ। ৮ এপ্রিল পাবনা, ৯ এপ্রিল বগুড়া, ১০ এপ্রিল রংপুর, ১৫ এপ্রিল যশোর। ১৩ এপ্রিল ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে তাঁর বাসভবনে শেখ মুজিব এক বৈঠক করেন। প্রাচীনপন্থী আওয়ামীলীগ নেতাদের অধিকাংশই পাকিস্তানপন্থী। তাই ছাত্রলীগ নেতাদেরকে তিনি প্রতিটি জেলায় আওয়ামীলীগের কমিটি দখল করে ছয়দফা জোরদার করার নির্দেশ দেন।
এদিকে পাকিস্তান সরকারও শুরু করে ‘মুজিব গ্রেপ্তার’ অভিযান। ১৮ এপ্রিল যশোরে গ্রেপ্তার, জামিন নিয়ে মুক্ত হলে ২১ এপ্রিল ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিলেট, সিলেট থেকে জামিনে মুক্ত হলে কারাফটক থেকে আবার গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আটবার গ্রেপ্তার ও মুক্ত হন শেখ মুজিব। প্রতিবারই মুক্ত হবার সাথে সাথে ছয়দফার সমর্থনে জনসংযোগ করেন।
৮ মে রাতে নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষ করার কয়েকঘন্টার মধ্যে দেশরক্ষা আইনে শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোশতাক, এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরীসহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সরকার। আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করে ৭ জুন বন্দীমুক্তি ও ছয়দফার পক্ষে হরতাল আহ্বান করে। নেতাদের সকলে কারাবন্দী থাকলেও সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাকের মত তরুণ ছাত্রনেতাদের তৎপরতায় অভূতপুর্ব সাড়া মিলে এই হরতালে। পুলিশের নৃশংসতায় সরকারী হিসেবেই নিহত হন ১০জন। এই হরতালের প্রেক্ষিতেই তেজগাঁ, টঙ্গী ও আদমজির শ্রমিকরা আওয়ামীলীগের সাথে সংযুক্ত হন। এর আগে শ্রমিক রাজনীতির একক নিয়ন্ত্রণ ছিল বামদের হাতে।
পরবর্তীতে অন্যরা মুক্তিপেলেও এবার শেখ মুজিবের দীর্ঘ কারাবাস হয়। অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী। প্রায় ৩বছরের কারাবাসের মধ্যে আগরতলা মামলাসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষিতে ছয়দফার আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। নগর থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম, চাকরীজীবি থেকে কৃষক-শ্রমিক পর্যন্ত সহজ ভাষায় সহজ সত্য উপলব্ধি করে– বাংলা হচ্ছে পাকিস্তানের উপনিবেশ। এই উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনই একমাত্র লক্ষ্য।
তথ্যসূত্রঃ
======
১। কারাগারের রোজনামচা। শেখ মুজিবুর রহমান। ২০১৭
২। বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম। ডাঃ মাহফুজুর রহমান। ১৯৯৩
৩। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ১৮৩০ থেকে ১৯৭১। ডঃ মোহাম্মদ হান্নান। ২০০৬
৪। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। মযহারুল ইসলাম। ১৯৭৪
৫। আমি সিরাজুল আলম খানঃ একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য। শামসুদ্দিন পেয়ারা। ২০২০
