নিজস্ব প্রতিবেদক
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় ভার্চুয়ালি ছাত্রসমাজের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। জুলাইয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়ক, যারা গণভবন, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্য ধ্বংসের হোতা, তারা গতকাল থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের বিষয়ে হুমকি দেন গণমাধ্যমকে, যেন শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করে কেউ। যদি কেউ প্রচার করে, তাহলে পরিণতি খারাপ করে দেওয়া হবে।
সেই লক্ষ্যে আজ সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় পরিকল্পিতভাবে জঙ্গি হামলা চালিয়েছে বৈসম্যবিরোধী আন্দোলনকারী নামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। শেখ হাসিনার বক্তব্যে যেন আওয়ামী লীগ কর্মীরা মনোবল চাঙ্গা করার সুযোগ না পায়, সেজন্যই বাংলাদেশের আঁতুড়ঘর হিসেবে খ্যাত ধানমণ্ডির বত্রিশ নাম্বারে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর বাড়ি, শেখ হাসিনার সুধা সদনের বাড়ি ও খুলনার শেখ বাড়িতে একযোগে জঙ্গি হামলা চালায় শিক্ষার্থীর ছদ্মাবরণে থাকা জঙ্গিরা।
সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহসহ অন্যরা দিনভর হুমকি-ধমকি দিয়েছেন ধানমণ্ডি-৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধুর ধ্বংস হওয়া বাড়ির জীর্ণ দেওয়ালও মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হবে বলে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্তদের এগিয়ে আসার ডাক দেওয়া হয় বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ থেকে। বিকেল থেকেই ধানমণ্ডির উদ্দেশ্যে রওনা হন উগ্রবাদীরা। হাতে হাতুড়ি, শাবল নিয়ে তারা রীতিমত জঙ্গী কায়দায় মিছিল করতে করতে বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি ভাঙতে রওনা হন।

গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বত্রিশ নাম্বারের বাড়ি
বিভিন্ন গণমাধ্যমের লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বুলডোজার নিয়ে ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দিয়ে ধানমণ্ডি-৩২-এর বাড়িটির দেয়ালগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেসময় সেখানে সরকার ও প্রশাসনের লোকজন নীরব ভূমিকায় উৎসাহ দিচ্ছিলেন। পুলিশ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা, এমনকি সেনা সদস্যদেরও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করতে দেখা গেছে।
রাত ৮টার কিছু আগে ৩২ নম্বরের বাড়িতে চালানো হয় ভাঙচুর। ৩২ নম্বরের প্রবেশমুখে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালটি আগেই বিনষ্ট করা হয়েছিল, এদিন সেটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ‘নারায়ে তাকবির’ দিয়ে জঙ্গী কায়দায় পুরো ভবনটির অবকাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। দ্বিতীয় তলার একাংশে দেওয়া হয় আগুন। ৫ই আগস্টের পর এদিন দ্বিতীয় দফা এই বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, যেখান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।

গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে খুলনার শেখ বাড়ি
মূলত শেখ হাসিনার বক্তব্য ধামাচাপা দিতে, মানুষের দৃষ্টি সরাতেই ধানমণ্ডি-৩২ নাম্বারে তাণ্ডব চালায় জঙ্গিবাদীরা। ছাত্রসমাজ যেন শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনার চেয়ে ভাঙচুরে মন দেয়, সেজন্যই এই আয়োজন বলে মনে করছেন অনেকেই। সেই লক্ষ্যেই সমন্বয়কদের উস্কানিতে শুরু হয় তাণ্ডবলীলা।
তারা শুধু ধানমণ্ডি-৩২ নাম্বারে তাণ্ডব চালায়নি, একইসময় শেখ হাসিনার স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম.এ ওয়াজেদ মিয়ার বাড়ি- সুধা সদনেও পুনরায় ধ্বংসলীলা চালিয়ে আগুন দেয়। একইসময় খুলনায় বঙ্গবন্ধুর চাচাতো ভাই শেখ আবু নাসেরের বাড়ি তথা শেখ বাড়িতেও তাণ্ডব চালানো হয়। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল, শেখ জুয়েলসহ ৫ ভাইয়ের বাড়ি। শেখ আবু নাসেরও পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট শহিদ হয়েছিলেন বত্রিশ নাম্বারের বাড়িতে।

আগুন দেওয়া হয়েছে সুধা সদনে
ইউনূস সরকারের দমন-পীড়ন, নির্যাতনের প্রতিবাদে ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি পণ্ড করতেই মূলত বৈষম্যবিরোধীদের এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু হয় গত কিছুদিন ধরে। আওয়ামী লীগের প্রতিবাদী কর্মসূচির লিফলেট বিতরণ করলেই গ্রেপ্তার ও গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে। খোদ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, যিনি নিজে একজন সাংবাদিক, তিনি গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরেছেন, যেন কেউ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিয়ে সংবাদ করতে না পারে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সমন্বয়করাও। সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে। আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে লিখলেই সাংবাদিকদের চাকরি যাচ্ছে।
আজ দেশজুড়ে জঙ্গী কায়দায় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও শেখ পরিবারের বাড়িঘরের শেষ ধ্বংসস্তুপের ওপর নতুন করে যে তাণ্ডবলীলা চালানো হলো, সেটাও ছিল পরিকল্পিত সন্ত্রাসেরই অংশ। শেখ হাসিনার বক্তব্যে যেন আওয়ামী লীগের কর্মীরা উজ্জীবীত হওয়ার চেয়ে আতঙ্কিত হন, তারই প্রচেষ্টা ছিল। এমনই অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
