।।মতামত।।
কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে পদার্পণ করে, তখন মহররমের চাঁদ আকাশে। ইসলামের ধ্যান ও ভাবগাম্ভীর্যের আলোকে মহররম চাঁদের মাসে আন্দোলন সংগ্রাম যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ। মহররম শব্দের অর্থই নিষিদ্ধ। আরবী মহররম মাসে মুসলমান ভাই-বোনেরা খুবই নিরব থাকবেন এবং নম্রতা ও ভদ্রতায় অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবেন, আমি এমনটিই জানি। কিন্তু যখন মহররমের চাঁদে আন্দোলন তীব্র হয়েছে এবং রক্তাক্ত হয়েছে বা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে, তখন আমি খুব বিমর্ষ হয়ে অতি মাত্রায় চিন্তিত হয়ে যাই, মনে প্রশ্ন জাগে ওরা কারা, ওরা কি তাহলে ইয়াজিদের বংশধর! আমি সবকিছু গভীর বিশ্লেষণে যাই। সরকার কর্তৃক কোটা বাতিল করণের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে দায়েরকৃত রীট পিটিশনটি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে হঠাৎ কার্য তালিকায় আসলো কিভাবে, কারা আনলো, কিভাবে শুনানী হলো এবং কারা রায় দিলো, সব কিছুর গভীরে যাই, অন্তরালে কি আছে খুঁজতে চেষ্টা করি। রায় প্রদানকারী বিচারপতি জনাব কামরুল কাদের এবং খিজির হায়াত-কে জানতে বুঝতে চেষ্টা করি। তাঁদের অভিভাবক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান সম্পর্কে জানতে বুঝতে চেষ্টা করি। আমার তথ্য সংগ্রহে উঠে আসে, জনাব কামরুল কাদের আওয়ামী লীগ পছন্দ করেন না, তাঁর বাবা ফজলুল কাদের গণফোরাম করতেন, জনাব কামরুল কাদের ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে খুবই ঘৃণা করেন বা অশ্রদ্ধা করেন। কিন্তু প্রশ্ন, তাহলে সে বিচারপতি হলো কেমনে, জানতে পারি জনাব ওবায়দুল হাসান তাঁর পক্ষে ছিলেন। তখন আমার উদ্বেগ প্রকট, জানা দরকার জনাব ওবায়দুল হাসান কেমন। ওবায়দুল হাসান সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে আমি খুবই হতাশ হই। ওবায়দুল হাসান আওয়ামী লীগ পছন্দ করেন না, তিনি বাকশাল করতেন এবং বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। কাকতালীয়ভাবে তাঁর সাথে রয়েছে রিজওয়ানা হাসানের সুসম্পর্ক, তাঁরই সুবাদে রিজওয়ানা হাসানের ঘনিষ্ঠ সহচর ইকবাল কবিরকে বিচারপতি বানানোতে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ লোক বললেন, ওবায়দুল হাসানের বিয়ের দাওয়াত কার্ডের নিবেদক ছিলেন তাঁর দুই মামা, একজন জাতীয় পার্টির এমপি, অপরজন বিএনপির এমপি, অথচ তাঁর বাবা-মা তখন জীবিত। তথ্যদাতা আমাকে ওবায়দুল হাসানের বিয়ের দাওয়াত কার্ড করার বিষয়ের চিন্তা থেকে তাঁর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সার্বিক ধারণা নিতে বললেন। আমার আরো জানা দরকার, প্রধান বিচারপতি হিসাবে অনিয়ম কিছু করেছে কি-না? দেখা হয়ে গেলো একজন ধার্মিক লোকের সাথে, তিনি বললেন, মানুষের আত্মার অভিশাপ বুঝেন? মানুষকে খুব তাচ্ছিল্য করতেন তিনি। একটা ঘটনার কথা বললেন, তিনি আইনজীবী থাকাকালীন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের মূল ভবনের ২১০ নং রুমে বসতেন। ঐ রুম থেকে অনেকেই বিচারপতি হয়েছেন, সর্বশেষ হয়েছেন বিশ্বজিৎ দেবনাথ। বিশ্বজিৎ বাবু বিচারপতি হওয়ার পর তাঁর নামে বরাদ্দ থাকা ২১০ নং রুমের আসনটি তাঁর জুনিয়রের পাওয়ার দাবিই অগ্রাধিকার। কিন্তু ওবায়দুল হাসানের ভাগিনা পরিচয়ে আইনঅঙ্গনসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব কাটিয়ে অনৈতিক সুবিধা ভোগকারী আইনজীবী মুশফিকুরকে ওবায়দুল হাসান সিটটি পাইয়ে দিলেন। তাতে বিশ্বজিৎকে কষ্ট দেয়া হলো, তাঁর জুনিয়রের আত্মাও কষ্ট পেলো, তাঁদের অন্তরাত্মার অভিশাপ তিনি গ্রহণ করলেন। ঐ রুমে নাকি সন্ধার পর তাঁর ভাগিনার তদবির বানিজ্যের আড্ডা বসতো, সন্ধ্যার পর হাইকোর্ট এলাকা নিরব হয়ে গেলেও রাত ১০/১১টা পর্যন্ত নাকি ঐ রুম সরগরম থাকতো, আবার তাঁর ভাগিনা মুশফিক জামাত-বিএনপির প্রডাক্ট।

শিরোনামের আলোচনায় আসি। কোটা সংস্কার আন্দোলনটি কার বিরুদ্ধে ছিলো? বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন কার বিরুদ্ধে ছিলো? যথাযথ সঠিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিলো কি? আমি মনেকরি পুরো বিষয়টায় ছিল বৈপরীত্য। কারণ কোটা প্রথা আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০১৮ সালে। তাহলে সরকার কোটা প্রথার বিরুদ্ধে, তাঁরা কোটা রাখলো না। সরকারের ঐ সিদ্ধান্ত চ্যালেন্জ করে সরকারের জারিকৃত প্রজ্ঞাপনটি বাতিল এবং অবৈধ ঘোষণার দাবিতে হাইকোর্টে রীট পিটিশন দায়ের করে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। রীট পিটিশন দায়ের করলে হাইকোর্ট প্রজ্ঞাপনটি স্থগিত রাখেননি এবং তার উপর স্থিতাবস্থার আদেশও প্রদান করেননি, শুধুমাত্র রুল দিয়েছেন। তারমানে দীর্ঘ পাঁচ বছর কোন কোটা ছিল না। হঠাৎ ২০২৪ এর ০৫ জুন হাইকোর্ট ডিভিশন রীট পিটিশনটির রুল শুনানীন্তে সরকার কর্তৃক কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে রুল নিষ্পত্তি করে রায় ঘোষণা করে, সরকার হাইকোর্টের উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে যায়। তাহলে কার্যত সরকারের অবস্থান এবং আন্দোলনকারীদের অবস্থান এক এবং অভিন্ন। অথচ আন্দোলনটা সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেলো। কিভাবে কি হলো, আপনারা আমরা সবাই যারযার মতো করে জানি, এই বিষয়ে আলোচনা না বাড়িয়ে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনায় আসি। আমার দৃষ্টিতে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন করতে হলে মহান সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধেই আন্দোলন করতে হয়। কারণ সৃষ্টিকর্তাই বৈষম্য করে মানুষের কর্ম ধর্ম জীবনাচার সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইচ্ছে করলে সকলকে এক জাতি করতে পারতেন, একই ধর্মাবলম্বী করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ইচ্ছে করেই বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করে মানবজাতিকে দুনিয়ায় রেখেছেন। সৃষ্টিকর্তাই মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। মূলতঃ সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখতেই বৈষম্যের সৃষ্টি করেছেন। সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ প্রয়োজন, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক, কেউ মুছি, কেউ নাপিত, কেউ ব্যবসায়ী, এভাবে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছেন। কারো সন্তান মাদ্রাসায় পড়বে, কারো সন্তান স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পার্থক্য করে পড়াশুনা করা তথা বড় হওয়ার ক্ষেত্রও মানবে বিভক্তি করে রেখেছেন সৃষ্টিকর্তা। আমেরিকায় একটি শহরের একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সঙ্গী আমেরিকা প্রবাসীকে জিজ্ঞেস করি, বাড়িটির দাম কত হতে পারে, উত্তর দিলেন বাংলাদেশি টাকায় তিনশত কোটি টাকার মতো হবে। আমার বাড়ির দাম হবে এক দেড় কোটি টাকা, আবার দেশে বাড়ি নাই ফুটপাতে থাকে এমন মানুষও আছেন, এখন আমরা যদি ঐ বাড়ির মালিকের সাথে আমাদের বৈষম্যের কথা ভেবে হিংসাত্মক হয়ে পড়ি, তাহলে কার প্রতি হিংসা প্রদর্শন করা হবে? এই বৈষম্য দূরীকরণে রক্তাক্ত সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ি, তাহলে কার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হবে, কার রক্ত ঝরবে! মানুষ একে অপরের উপর নির্ভরশীল, বৈষম্য না থাকলে নির্ভরশীলতা থাকবে না, সমাজে শৃঙ্খলাও থাকবে না। এখন রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে কিছু বলি, রাষ্ট্রের সংস্কার বলতে কি বুঝায়? সংস্কার মানে কি? বিশেষজ্ঞদের ব্যাখায় রয়েছে পার্থক্য। কিন্তু কথা হলো, আমরা সবাই বলি, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, তাহলে জনপ্রতিনিধি না হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হয়ে জনগণের রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট ইউনুস সরকার পেলো কোথায়? তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, মহররম মাসের আন্দোলন তাঁকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। এমতাবস্থায় আমি বলবো, বাঙ্গালী হুজুগে অনেক কাজ করে, আবেগে অনেক কাজ করে, বাঙালি অনেক সময়ই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে, মহররমের চাঁদে বাঙালি কি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল কি-না, হুজুগে পড়ে আন্দোলন করেছিলো কি-না, একটা নিরপেক্ষ সুষ্ঠ ভোট দিয়ে দেখুন তো, লেভেল প্লেয়িং পরিবেশ দিয়ে দলমত নির্বিশেষে সকলকে কাজ করার উন্মুক্ত পরিবেশ দিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দেখুনতো আপনাদের অবস্থান। ফ্যাসিষ্ট বলতে কি বুঝাতে চান? আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে আপনাদের পাত্তা দেয়নি, তাইতো? এখন আপনারা ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগকে পাত্তা দিলেন না, তাহলে আপনাদের পরিচয় কি? প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব জিইয়ে রেখে রাষ্ট্র সংস্কার হবে না। রাষ্ট্রের মালিক রাষ্ট্রের সকল নাগরিক। আপাততঃ এখানেই শেষ করছি।
আমার বক্তব্য যারা মনযোগ দিয়ে পড়লেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকছি।
পূরন দাস।
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৪।
