মিয়ানমারে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত টেকনাফবাসী

মিয়ানমারে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত টেকনাফবাসী
শেয়ার করুন

টেকনাফ, ২৯শে নভেম্বর- কয়েকদিন বিরতির পর আবারও টেকনাফ সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে একের পর এক বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তারা এমন শক্তিশালী শব্দ আগে কখনো শোনেননি। তাদের মতে, দিনবদলের সময় পরিস্থিতি বেশ শান্ত থাকলেও, গত এক সপ্তাহ ধরে সীমান্তের ওপার থেকে রাতের বেলা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিশেষত গতকালের বিস্ফোরণটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ এবং স্থানীয়রা একে ‘ভীতিকর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রতিটি বিস্ফোরণের পর টেকনাফের মাটি কেঁপে উঠছিল।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে আলাদা করেছে নাফ নদী। বাংলাদেশের টেকনাফ নদীর এক পাশে এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহর নদীর অন্য পাশে অবস্থিত। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। যখনই এই সংঘাত তীব্র হয়, বাংলাদেশেও তা অনুভূত হয়।

এবারও স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, সীমান্তের ওপারে এই সংঘর্ষের কারণে গোলাগুলি এবং বিমান হামলার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা জাকারিয়া আলফাজ জানান, “বিমান হামলা হলে বিকট শব্দ হয়, যার কারণে ঘরবাড়ি পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। রাতে এসব শব্দ শুনে স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, বিশেষ করে ছোট শিশুরা ভয় পায়।” তিনি আরও বলেন, “গত সাত থেকে দশ দিন ধরে বোমার বিস্ফোরণের শব্দ শুনে মনে হয় যেন বোমাগুলো আমাদের গ্রামে পড়ছে, যার ফলে বাড়িঘর কেঁপে ওঠে।”

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং সারা রাতই নিদ্রাহীন ছিলেন। দিনেও একই ধরনের পরিস্থিতি থাকে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “দিনে বিভিন্ন শব্দ থাকায় এই বিস্ফোরণের শব্দ তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না, কিন্তু রাতে এবং ভোরে যে বিস্ফোরণটি হয়, তা মারাত্মক হয়।”

তিনি এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই সমস্যার সমাধান জরুরি। যদি এটা সাময়িক হত, তাহলে চিন্তার কিছু ছিল না, কিন্তু এটি এখন নিয়মিত হয়ে উঠছে।”

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিক আজিম নিহাদও  জানান, “এ ধরনের বিকট শব্দ আগে তেমন শোনা যায়নি।” তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে ১টার মধ্যে টেকনাফের বাসিন্দারা এসব শব্দ শোনেন। মংডু ও তমব্রু সীমান্ত থেকেই এসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, “গতকাল রাতে টেকনাফ এবং সেন্টমার্টিনের আশপাশের এলাকায় কেঁপে উঠেছিল। কিছুদিন আগে এ ধরনের শব্দ শোনা যায়নি, তবে এবার আবার তা শোনা গেছে। বিজিবির সঙ্গে কথা বলে জানলাম, সেখানে বিমান হামলা হয়েছে এবং আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।”

বিবিসি বার্মিজ সার্ভিস জানায়, বাংলাদেশ সীমান্তে বর্তমানে বড় ধরনের সংঘাত চলছে না, এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী সীমান্তে নেই। তবে টেকনাফ সীমান্তের কাছে মংডু শহরে কিছু বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল আরাকান আর্মির অগ্রগতি ঠেকানো, যাতে তারা মংডু শহর দখল করতে না পারে।

অপরদিকে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের জন্য একটি ভবিষ্যত সমস্যা হতে পারে, মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম। তিনি জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে রোহিঙ্গাদেরকে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের কিছু অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে এই সংঘর্ষে নামানো হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশের ভেতরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, তবে মিয়ানমারে যদি এই সংঘাত আরও তীব্র হয় এবং রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যবহার করে, তাহলে এর প্রভাব বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের ওপরও পড়তে পারে।”

এদিকে, বাংলাদেশে প্রায় ১০ থেকে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাস করছে, যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে। এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের এই সংঘাতে বাড়লে বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদেরও এতে প্রভাবিত হতে হবে, কারণ তারা তাদের আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের ওই সংঘর্ষে জড়িত দেখতে পেলে, তারা এই সংঘর্ষে যোগ দিতে চাইবে।

Visited 30 times, 1 visit(s) today