সোর্স-পুলিশের সমন্বয়ে ট্রাক আটকে ৩০ হাজার ইয়াবা লোপাটের অভিযোগ: ট্রাকের ক্যামেরা ভেঙে মেমোরি ফরম্যাট

সোর্স-পুলিশের সমন্বয়ে ট্রাক আটকে ৩০ হাজার ইয়াবা লোপাটের অভিযোগ: ট্রাকের ক্যামেরা ভেঙে মেমোরি ফরম্যাট
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


চট্টগ্রামে মোটরসাইকেল দিয়ে সড়কে বাধা তৈরি করে একটি ট্রাক থামানো এবং সেখান থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাতকানিয়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও তাদের সোর্সদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নের এম চর হাটের কাছে মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাট এলাকার একটি নির্জন সড়কে ট্রাকটি থামানো হয়। এরপর সোর্স রবিন ও মোমিনের সহায়তায় থানার কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ ও গাজী মো. মহসিন ট্রাকটির সামনের আসনে উঠে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেন।

এ ঘটনার দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ স্থানীয় সংবাদিকদের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে। ফুটেজে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদকে ট্রাকের সামনে এবং মহসিনকে চালকের পাশে দেখা যায়। তাদের দুজনের মুখেই মাস্ক ছিল।

পরে থানার একাধিক উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল তাদের শনাক্ত করেছেন বলে জানা যায়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, একই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে রবিন ও মোমিনের সহায়তায় দুই কনস্টেবল ট্রাকটি সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাট রেলক্রসিংয়ের কাছে একটি এলপিজি পাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে তারা ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে ফেলেন।

ট্রাকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পুরো কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে ছিলেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম মাহবুবুল ইসলাম বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি এ সময় থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহাকেও সঙ্গে নিয়ে যান।

জানা গেছে, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে এসআই মাহবুব ও কনস্টেবল প্রীতম লোহাগাড়া এলাকায় ছিলেন। একটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় কনস্টেবল ফয়েজ ও মহসিনও লামা সীমান্তসংলগ্ন পুটিবিলা এলাকায় অবস্থান করছিলেন।

থানাসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নজরে আসার পর পুলিশ অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ইসলামনগরে নীল রঙের একটি মিনিট্রাক সড়কের পাশে রেখে একটি হোটেলে খাবার খাচ্ছিলেন চালক নাছির। ট্রাকটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ড-১২-৭৫৩৮। সেখানে পুলিশের  সোর্স রবিন ও মোমিনের সঙ্গে তার দেখা হয়।

পরে নাছির মাতামুহুরী নদীর সেতুর পাশের একটি পাম্প থেকে জ্বালানি নিয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামার দিকে রওনা হন। সেখানে এক মাদক বহনকারীর কাছ থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা সংগ্রহ করে ট্রাকের চালকের আসনের নিচে বানানো বিশেষ জায়গায় লুকিয়ে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর খালি ট্রাক নিয়ে পুটিবিলা সড়ক ধরে লোহাগাড়ার ফকিরহাটের দিকে রওনা দেন। সেখানে ট্রাকে সবজি বোঝাই করার কথা ছিল।

গন্তব্যে পৌঁছানোর কিছু আগে থেকে রবিন, মোমিন ও কনস্টেবল ফয়েজ ও মহসিন একটি লাল মোটরসাইকেল এবং একটি নোহা গাড়িতে করে ট্রাকটির পিছু নেন।

একপর্যায়ে নির্জন জায়গায় রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে সড়কে বাধা তৈরি করে ট্রাকটি থামান। এরপর কনস্টেবল মহসিন ট্রাকের জানালা খুলে চালকের পাশের আসনে ওঠেন এবং নাছিরের হাতে হাতকড়া পরান। পরে কনস্টেবল ফয়েজও ওই আসনে বসেন।

এরপর ট্রাকটি আমিরাবাদ ও ঠাকুরদীঘির বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে কেরানীহাট রেলক্রসিংয়ের পাশের একটি এলপিজি পাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে নাছিরকে ট্রাক থেকে নামিয়ে তল্লাশি করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, চালকের আসনের নিচে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা বের করে নিজেদের হেফাজতে নেন তারা। পরে এসআই মাহবুব মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছালে অন্যরা ট্রাকের চাবি ও চালককে তার জিম্মায় দিয়ে দ্রুত চলে যান।

এসআই মাহবুব নাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আড়াল করার উদ্দেশ্যে এসআই মাহবুব থানায় ট্রাক আটকে রাখার খবর দেন এবং আরও দুই পুলিশ সদস্যকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনেন। তবে ট্রাকে আগে তল্লাশি হয়েছে বলে তারা জানতে পারলে সেখান থেকে চলে যান।

পরে এসআই মাহবুব চালক নাছিরের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে ঘটনার একটি ভিডিও ধারণ করেন এবং তাকে ট্রাকসহ ছেড়ে দেন। এরপর নাছির চট্টগ্রাম নগরের দিকে রওনা হন।

পুলিশের সোর্স মোমিন আগে মাইক্রোবাস এবং পরে ট্রাক চালাতেন। বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠার পর তিনি পুলিশের মাদক উদ্ধারের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন।

ট্রাকচালক নাছিরের ভাষ্য, লামা থেকে লোহাগাড়া যাওয়ার পথে মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাটে পৌঁছালে রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে তার ট্রাক থামান। এক পুলিশ সদস্য ট্রাকের সামনের আসনে উঠে তার এক হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর কনস্টেবল ফয়েজও ট্রাকে ওঠেন।

নাছিরের দাবি, এ সময় তারা ট্রাকে থাকা ড্যাশবোর্ড ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলেন।

নাছির আরও বলেন, তাকে লোহাগাড়া ট্রাফিক পুলিশ বক্সে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে বলা হয়, অন্য গাড়িকে পাশ না দেওয়ায় ট্রাফিক আইনে মামলা দেওয়া হবে। পরে ফোনে কথা বলার পর তাকে আবার সাতকানিয়ার ঠাকুরদীঘি পেট্রোল পাম্প এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে রবিন ও মোমিনের মোটরসাইকেলের সঙ্গে আরেকটি মোটরসাইকেলে তিন যুবক যোগ দেন।

নাছিরের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাকে কেরানীহাট রেলক্রসিংয়ের পর একটি এলপিজি পাম্পের নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় একজন পুলিশ সদস্য আসেন। নাছিরকে ট্রাক থেকে নামিয়ে অটোরিকশায় তোলা হয় এবং তার এক হাত অটোরিকশার লোহার অংশের সঙ্গে হাতকড়া দিয়ে আটকানো হয়। ওই পুলিশ সদস্য তাকে নিয়ে অটোরিকশাটি কিছুটা সামনে সরিয়ে দাঁড়ান।

এ সময় ফয়েজ, রবিন, মোমিনসহ অন্য পুলিশ সদস্য ও তাদের সঙ্গীরা তল্লাশির নামে ট্রাকের জিনিসপত্র এলোমেলো করেন বলে নাছির অভিযোগ করেন।

নাছিরের দাবি, এরপর ট্রাকের আসনের নিচে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াবাগুলো তিনটি বড় পোটলায় রাখা ছিল, প্রতিটিতে ১০ হাজার করে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরে তার ট্রাকের সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ফরম্যাট করে দেওয়া হয়।

নাছিরের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও সোর্স ইয়াবা নিয়ে চলে যাওয়ার পর অন্যরা তাকে ঘুরিয়ে সী ওয়ার্ল্ড রেস্তোরাঁর সামনে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তাকে ওবাইদিয়া মাদ্রাসার ফটকের কাছে সড়ক বিভাগের একটি পরিত্যক্ত ভবনের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে দুই পুলিশ সদস্য ট্রাকের চাবি এসআই মাহবুবের কাছে দিয়ে চলে যান।

পরে এসআই মাহবুব ও এক কনস্টেবল ট্রাকে ইয়াবা আছে বলে অভিযোগ তুলে তাকে মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

নাছির বলেন, এর আগে একদল লোক তার ট্রাক থেকে ইয়াবা নিয়ে গিয়েছিল—গ্রেপ্তারের ভয়ে তিনি সে কথা পুলিশকে জানাননি। পরে ঘটনাস্থলে আসা আরও দুই পুলিশ সদস্যকে তিনি জানান, কয়েক ঘণ্টা ধরে তার ট্রাকটি বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে তল্লাশি করা হয়েছে। এ কথা শোনার পর ওই দুই সদস্য আর তল্লাশি করতে চাননি এবং চলে যান।

এরপর এসআই মাহবুব ট্রাক তল্লাশি করেননি—এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও ধারণ করে তাকে ছেড়ে দেন। নাছির জানান, পরে তিনি ট্রাক নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে চলে যান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো লাভ হবে না। আপনাকে এ বিষয়ে কিছু জানাতেও আমি রাজি নই। ঘটনার দিন রাতে আমি থানায় ছিলাম। কিছু জানার থাকলে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।”

অপর কনস্টেবল গাজী মো. মহসিন বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহা বলেন, ঘটনার রাতে এসআই মাহবুবের দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য তিনি তার সঙ্গে লোহাগাড়া গিয়েছিলেন। চিকিৎসককে না পেয়ে তারা ফিরে আসেন। পরে ঠাকুরদীঘি হয়ে কেরানীহাটে যান।

প্রীতমের ভাষ্য, ওই সময় তিনি মাহবুবকে ফোনে সোর্সের সঙ্গে কথা বলতে শুনেছিলেন। এর অনেকক্ষণ পর ট্রাকটি আটকানো হয়। সাধারণত তিনি বাইরে দায়িত্ব পালন করেন না, তবে সেদিন মাহবুব তাকে ডেকে নিয়েছিলেন।

সোর্স রবিনের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। অপর সোর্স মোমিনের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এসআই এসএম মাহবুবুল ইসলাম বলেন, সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা একটি ট্রাক থামিয়েছিলেন। পরে চালক জানান, ট্রাকটিতে আগেই তল্লাশি হয়েছে। এরপর তিনি সোর্সকে বকাঝকা করেন, ট্রাকটিতে আর তল্লাশি না করে চালকের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেন এবং তাকে ছেড়ে দেন।

কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব বলেন, প্রায় এক বছর আগে তার সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি ব্যস্ত থাকায় ফয়েজকে দিয়ে সন্তানকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। তখন ফয়েজ তার সন্তানের অনেক যত্ন নিয়েছিলেন।

সেই ঘটনার পর থেকেই তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় বলে জানান তিনি।

সোর্স রবিনের সঙ্গে পরিচয়ের বিষয়ে মাহবুব বলেন, আগে রবিনের বাবা মাছ ব্যবসায়ী বাবুলকে একটি রাজনৈতিক মামলায় আটক করা হয়েছিল। তখন রবিন থানায় এসেছিলেন এবং সেখানেই তাদের পরিচয় হয়। পরে রবিনকে মাদক পাচারসংক্রান্ত কোনো তথ্য পেলে তাকে জানাতে বলেছিলেন বলে জানান মাহবুব।

সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল আলীম বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে আসার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

Visited 9 times, 1 visit(s) today