‘১৭ বার স্মারকলিপি’র বক্তব্য তাঁর নামে ছড়ানো হয়েছিল, ফ্যাক্টচেকেও তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। ঢাকা, ১১ অক্টোবর, ২০২৬।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির বিপরীত পাশের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালো রং লাগানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার মঞ্চ২৪ এর চারজনকে রোববার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার একটি পুরোনো দাবি আবার আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এই দাবিই অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের নামে ছড়ানো হয়েছিল। তখন তিনি নিজেই তা অস্বীকার করেন।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কালি লাগানোর চেষ্টার সময় উপস্থিত লোকজন প্রশ্ন তুললে এক তরুণী দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশবিরোধী ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।
২০২৪ সালে কী ঘটেছিল
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করার জন্য ইংরেজদের নিকট ১৭ বার স্মারকলিপি দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”, এমন বক্তব্য অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের নাম ব্যবহার করে ২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। ৭ সেপ্টেম্বর সংবাদ প্রকাশ ও ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার প্রায় একই সময়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সলিমুল্লাহ খান জানান, রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে ঢাবি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা নিয়ে তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, “একেবারেই ‘ভুয়া’ এই প্রচারণা।” রিউমর স্ক্যানার দাবিটিকে মিথ্যা বলে চিহ্নিত করে। তাদের অনুসন্ধানে দাবিটির পক্ষে কোনো গণমাধ্যম বা বিশ্বস্ত সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়নি।
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে সম্ভাব্য প্রথম পোস্টটি পাওয়া যায় ৫ সেপ্টেম্বর রাতে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। পোস্টে কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ ছিল না। প্রচারণাটি ছড়ায় সদ্য মুক্তি পাওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমীর জাতীয় সংগীত বদলের দাবির পরপর।
সলিমুল্লাহ খান যা বলেছিলেন
সলিমুল্লাহ খান জানান, তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথের কোনো উল্লেখ ছিল না। তাঁর কথার অন্যতম উৎস রমেশচন্দ্র মজুমদারের স্মৃতিকথা। সেখানে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাসবিহারী ঘোষ ও আনন্দচন্দ্র রায়সহ কয়েকজন নেতার বিরোধিতার কথা আছে। রবীন্দ্রনাথ ঢাবির বিপক্ষে লিখেছিলেন, এমন কোনো অভিযোগ ওই বইয়ে নেই বলেও তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকা সফরে এসেছিলেন।
রিউমর স্ক্যানার ২০২২ সালের একটি ভিডিও বক্তব্যও পায়। সেখানে সলিমুল্লাহ খান বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেননি, তবে তাঁর উৎসাহ একটু কম ছিল।
২০২৪ সালে প্রকাশিত সংবাদঃ ঢাবি প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সলিমুল্লাহ খানের নামে ‘গুজব’ প্রচার
বিতর্ক পুরোনো
এ প্রশ্নে মতভেদ আগেও ছিল। আমাদের সময়ে প্রকাশিত একটি মতামত লেখায় অভিযোগ করা হয়, সলিমুল্লাহ খান রবীন্দ্রনাথকে ঢাবি-বিরোধীদের সারিতে ফেলতে চেষ্টা করেছেন। লেখাটিতে বলা হয়, তিনি ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার জনসভার যে কথা বলেন, সেদিন রবীন্দ্রনাথ কলকাতায়ই ছিলেন না, ছিলেন শিলাইদহে। বিডিনিউজ২৪-এ প্রকাশিত আরেকটি মতামত লেখায়ও কুলদা রায় একই তথ্য এবং এই যুক্তি তোলা হয়েছে যে বিরোধী হলে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বক্তৃতায় আমন্ত্রণ জানাত না।
মামলার অগ্রগতি
রিমান্ডে নেওয়া চারজন হলেন মঞ্চ২৪ এর আল নূর মোহাম্মদ আয়াস, সাকিবুস হাসান, সুজন মিয়া ও মারজিয়া খন্দকার রিমি। শাহবাগ থানায় দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আয়াস ও সাকিবুসের তিন দিন এবং সুজন ও রিমির দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আয়াস ‘সংলাপ ফোরাম’-এর সভাপতি। ৯ অক্টোবর রাতে রিমি গ্রাফিতিতে কালো রং লাগান। মামলার অভিযোগে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টার কথা বলা হয়েছে।
- ঢাবি প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সলিমুল্লাহ খানের নামে ‘গুজব’ প্রচার, সংবাদ প্রকাশ (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪)
- রবীন্দ্রনাথের ঢাবি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার অভিযোগের বিষয়ে সলিমুল্লাহ খানের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচার, রিউমর স্ক্যানার (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪)
- রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি: আয়াসসহ ৪ জন রিমান্ডে, আজকের পত্রিকা
- Dhaka Shilpakala Academy প্রতিবেদন, উত্তরবঙ্গ সংবাদ
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ও রবীন্দ্রনাথ, বিডিনিউজ২৪
- সলিমুল্লাহ খানের পাঁচ মিথ্যাচার, আমাদের সময়
