বছরওয়ারি চাঁদা দাবি: না দেওয়ায় বান্দরবান-থানচি সড়কে বাস বন্ধ ৪ দিন ধরে, মুখ খুলছে না পুলিশও

বছরওয়ারি চাঁদা দাবি: না দেওয়ায় বান্দরবান-থানচি সড়কে বাস বন্ধ ৪ দিন ধরে, মুখ খুলছে না পুলিশও
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব সংবাদদাতা


সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের চাঁদা দাবির ঘটনা এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে চার দিন ধরে বান্দরবান-থানচি সড়কে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে এই পথে যাতায়াত করা চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, পর্যটকসহ সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

আজ ১১ই অক্টোবর,রোববার দুপুরে বান্দরবান-থানচি বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল আমিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, গত কয়েক দিন কিছু বাস চলাচল করলেও ৭ই অক্টোবর থেকে বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। তবে কারা চাঁদা চেয়েছে বা কত টাকা দাবি করেছে, সে বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি নুরুল আমিন।

চাঁদা দাবির ঘটনা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় বাস বন্ধ থাকায় গাড়িগুলো স্টেশনে পড়ে আছে। চালক ও শ্রমিকদেরও অলস সময় কাটছে।

বাসচালক আব্দুল খালেক বলেন, বান্দরবান-থানচি সড়কে বাস চলাচল স্বাভাবিক রাখতে একটি সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা বছরে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ নিয়ে তিন মাস ধরে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চললেও কোনো সমাধান হয়নি। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গত বুধবার থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে এ সড়কে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

বান্দরবান-থানচি সড়কের লাইনম্যান মংসিংনু মারমা জানান, বান্দরবান থেকে থানচিগামী একটি যাত্রীবাহী বাসের চালকের মোবাইল ফোনে একটি চক্র চাঁদা দাবি করে। এরপর চালকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে তারা বাস চালাতে চাইছেন না।

পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত বাস চলাচল স্বাভাবিক করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় বান্দরবান থেকে থানচি যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল সাঙ্গু নদীপথ। তবে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বর্তমানে সড়কপথই যাতায়াতের প্রধান ভরসা। এমন পরিস্থিতিতে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের বিকল্প হিসেবে চাঁদের গাড়ি (জিপ) ভাড়া করে যেতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় তাদের দ্বিগুণ টাকা গুনতে হচ্ছে।

থানচি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার আংবাচিং মারমা জানান, গত বৃহস্পতিবার অফিস শেষে তিনি বাড়িতে গিয়েছিলেন। রোববার থেকে ব্যাংক খোলার কারণে শনিবার থানচি ফিরতে বান্দরবানের থানচি বাসস্টেশনে এসে দেখেন, বাস ছাড়ছে না। পরে চাঁদের গাড়িতে করে যেতে হচ্ছে তাকে। এতে স্বাভাবিক ৩২০ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে।

বিদ্যামণিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অলড্রিন বলেন, ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে বান্দরবান এসেছিলাম। পরীক্ষা শেষে শনিবার বাড়ি ফেরার জন্য থানচি বাসস্টেশনে এসে দেখি, বাস চলাচল বন্ধ। পরে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে সাড়ে আট হাজার টাকায় একটি চাঁদের গাড়ি ভাড়া করি। এতে স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে।

থানচির ছোট মদক এলাকার বাসিন্দা পূর্ণিমা ত্রিপুরা চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। দেড় বছর পর বাড়ি ফিরতে শনিবার সকালে বাসস্টেশনে এসে বাস না পেয়ে দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেন। পরে অন্যদের সঙ্গে চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। এতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুনতে হচ্ছে তাকে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা থেকে থানচি যাওয়ার জন্য বাসস্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন পর্যটক ইয়াসমিন ফারজানা। তিনি বলেন, “আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বান্দরবান বেড়াতে এসেছি। দুই দিনের ট্যুরে থানচি যাব। কিন্তু স্টেশনে কোনো বাস ছাড়ছে না। আমাদের এই দুর্ভোগ কবে কমবে, জানি না।”

চাঁদের গাড়ির চালক ফিরোজ খান বলেন, “বাস বন্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে থানচি সড়কে চাঁদের গাড়ি চলছে। প্রতিটি গাড়িতে ১২-১৩ জন যাত্রী যেতে পারেন। জনপ্রতি ভাড়া নিতে হচ্ছে ৬০০ টাকা।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদেরও ভয় লাগছে। তবু জীবিকার তাগিদে ছুটে চলছি।”

থানচি সড়কে বাস চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদ পারভেজ। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে তিনি রাজি হননি।

Visited 2 times, 1 visit(s) today