আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২ ঘরে তালা: ঘর বরাদ্দে আর্থিক অনিয়ম, সন্ধ্যায় নারী-মাদকের কারবার

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২ ঘরে তালা: ঘর বরাদ্দে আর্থিক অনিয়ম, সন্ধ্যায় নারী-মাদকের কারবার
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব সংবাদদাতা


লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য তৈরি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া অনেকেই এসব ঘরে না থেকে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে থাকছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে সন্ধ্যার পর মাদকের আড্ডাও বসে। তবে মাদক ও নারী ব্যবসার অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ নেই।

সরকারি হিসাবে, রায়পুর উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৪৬৭টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৫টি ঘরে বাসিন্দা রয়েছেন; বাকি ১৫২টি ঘর তালাবদ্ধ বলে জানানো হয়েছে।

বরাদ্দ পাওয়া অনেকে গ্রামের বাড়িতে থাকায় প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের নতুন করে ঘর দেওয়ার দাবি উঠেছে।

উপজেলার বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজার, দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের খলিফারহাট, মিয়ারহাট ও হাজিমারা এবং উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের মদিনাবাজারের আশ্রয়ণ ও আবাসনকেন্দ্র ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।

সরেজমিনে অনেক ঘরের দরজায় তালা দেখা গেছে। কোনো কোনো ঘরের সামনে আগাছা ও ময়লা জমে আছে। কয়েকটি ঘরের টয়লেট ও পানির কল নষ্ট; কোথাও কল চুরি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানির অভাব, জলাবদ্ধতা, পুকুরের ঘাট ভেঙে যাওয়া এবং কবরস্থানের ব্যবস্থা না থাকার কথাও জানিয়েছেন।

রায়পুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি ঘরে কেউ থাকছেন না। ঘরগুলো পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।

১৫২টি ঘরে তালা

রায়পুর উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৬৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৯৪টি ও শিবপুরে ১০টি ঘর রয়েছে। কেরোয়া ইউনিয়নের মীরগঞ্জ বাজারের পাশে আছে ৯টি ঘর।

দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের মিয়ারহাটে ৪৫টি, হাজিমারায় ৪৪টি এবং কারিমিয়ায় ১১৭টি ঘর নির্মিত হয়েছে। উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের কুচিয়ামারায় রয়েছে ২৪টি ও মদিনাবাজারে ৪৩টি ঘর। দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়নের উদমারা গ্রামে আছে ৭৯টি ঘর।

এলাকাভিত্তিক হিসাবে বাংলাবাজারে ৪০টি, মিয়ারহাটে ১৪টি, হাজিমারায় ১৪টি, মদিনাবাজারে ১৩টি, কুচিয়ামারায় ৮টি, উদমারায় ১১টি এবং কারিমিয়ায় ৩২টি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে।

বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বদলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বচ্ছল ব্যক্তি এবং জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়স্বজন ঘর পেয়েছেন।

বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেকে সেখানে না উঠে নিজেদের বাড়িতে বসবাস করছেন।

দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের হাজিমারা ও মিয়ারহাটসহ কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে ঘর বরাদ্দের সময় উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঘরের মেঝে ও বারান্দায় মাটি ভরাটের কাজের জন্যও টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া ও স্থানীয় সমাজসেবক মনির হোসেন মোল্লা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ তারা পেয়েছেন।

উপজেলা ভূমি অফিস এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলেও তারা জানান। তাদের দাবি, কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে সন্ধ্যার পর মাদকের আড্ডা বসে।

বরাদ্দ কম, নির্মাণকাজ নিম্নমানের—চেয়ারম্যানের দাবি

দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরাজি বলেন, বরাদ্দের পরিমাণ কম থাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর নির্মাণকাজ নিম্নমানের হয়েছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মেঝে ও বারান্দায় মাটি ভরাটের জন্য উপকারভোগীদের কাছ থেকে মেম্বারদের মাধ্যমে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। নিজেদের ঘর নির্মাণ হওয়ায় অনেকে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমিকের কাজ করেছেন।

ঘরের রেজিস্ট্রির জন্য ভূমি অফিস প্রতিজনের কাছ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা নিয়েছিল বলেও তিনি জানান।

পানির সংকট, নষ্ট টয়লেট

আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দারা জানান, অনেক জায়গায় গভীর নলকূপের পানির সরবরাহ নিয়ে সমস্যা রয়েছে। কোথাও পুকুর থাকলেও ঘাট ভাঙা। কয়েকটি ঘরের পাশের পুকুরের পাড় ভেঙে যাওয়ায় ঘরগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। অনেক টয়লেটও ব্যবহার করার মতো অবস্থায় নেই। পানির কল নষ্ট বা চুরি হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিশুদ্ধ পানির সংকট, কবরস্থান এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আবেদন করেও কার্যকর ব্যবস্থা মেলেনি।

ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদি হাসান কাউছার বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে। বরাদ্দের তালিকায় কোনো স্বচ্ছল ব্যক্তির নাম থাকলে তাকে বাদ দিয়ে প্রকৃত গৃহহীনদের ঘর দেওয়া হবে।

শিগগিরই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবদুল হাই খান বলেন, এর আগে প্রকৌশলী আশিকুর রহমান ঘরগুলোর নির্মাণকাজ তদারক করেছিলেন।

সরকারি নকশায় প্রতিটি আশ্রয়ণ ঘরের আয়তন প্রায় ৫০০ বর্গফুট। প্রতিটি ঘরে দুটি শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, ইউটিলিটি রুম, টয়লেট ও বারান্দা রাখার কথা। দুর্যোগসহনীয় এসব ঘরে সোলার ব্যবস্থা ও বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থাও থাকার কথা রয়েছে। প্রতিটি সেমিপাকা ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

Visited 8 times, 8 visit(s) today