স্টুডিও ভাঙচুর, সরকারের সমালোচনাঃ জবাবে মুক্তাদিরের বার-মোগল শ্বশুরের ওয়ারহাউজে বিশেষ অভিযান

স্টুডিও ভাঙচুর, সরকারের সমালোচনাঃ জবাবে মুক্তাদিরের বার-মোগল শ্বশুরের ওয়ারহাউজে বিশেষ অভিযান
শেয়ার করুন

সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের চার গুদাম সিলগালা; তদন্তে এনবিআর ও বিএফআইইউ।
সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে উল্টো চাপে প্রভাবশালী পরিবার?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২ অক্টোবর ২০২৬


রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজে নিজের স্টুডিওতে সশস্ত্র হামলার বিচার চেয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। এর কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর শ্বশুর ও দেশের অন্যতম বড় বার ব্যাবসায়ী ও মদ আমদানীকারক  শেখ নূর ইসলামের প্রতিষ্ঠানে একের পর এক সরকারি অভিযানের খবর এসেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্যও যদি নিরাপত্তা চেয়ে প্রতিকার না পান, উল্টো সরকারী বাহিনীর দমন-নীপিড়ন ও হেনস্থার শিকার হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা কোথায়?

 

হামলা ও মামলা

গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’ তছনছ হয়। তিনি কর্মীদের মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ করেন। পরদিন সকালে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। তাঁর দাবি, চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় প্রতিশোধ হিসেবে হামলা চালানো হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। চাপাতি উদ্ধারের কথাও পুলিশ জানিয়েছে।

সরকারের বক্তব্য

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, সালমান মুক্তাদির পুরো ঘটনা না জেনে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষ্য, নিউ গিনি প্রপার্টিজের ভেতরে জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জের ধরে হামলা হয়েছে। ডিএমপির এক শীর্ষ কর্মকর্তাও জমির দখল-বেদখল নিয়ে বিবাদের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের এক নেতা হামলায় “লজ্জিত” বলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এনসিপি ও অন্য রাজনৈতিক নেতারাও হামলার নিন্দা করেছেন।

 

এরপর যা ঘটল

সালমান মুক্তাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার কথা তোলেন এবং সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন। এর পর সূত্রের বরাতে জানা যায়, তাঁর শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের ব্যাংক লেনদেন এবং কানাডায় সম্পদের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তদন্ত শুরু করেছে।

১ অক্টোবর গভীর রাতে দক্ষিণ গুলশানে ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এ কাস্টমস গোয়েন্দা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) যৌথ অভিযান চালানোর খবর পাওয়া গেছে। অননুমোদিতভাবে শুল্কমুক্ত মদ মজুতের অভিযোগে নূর ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি গুদাম সিলগালা করা হয় বলে জানা গেছে।

গতকাল রাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC) এবং কাস্টমস গোয়েন্দাদের যৌথ অভিযানে দেখা যায়, মাত্র দুটি গুদামের অনুমোদন থাকলেও তিনি চারটি বিশাল ওয়্যারহাউজে বিপুল পরিমাণ আমদানি করা শুল্কমুক্ত মদ মজুত করে আসছিলেন। কাস্টমস বিধির বাইরে গিয়ে এভাবে গোপনে বিশাল পরিসরে মদ মজুত ও ব্যবসার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কারণেই তাকে গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা নথিতে এই খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তদন্তে তার বন্ডেড ওয়্যারহাউজ থেকে নথিপত্র ছাড়াই বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও বিয়ার (যেমন প্রায় ২,২৫০ কার্টন হাইনেকেন বিয়ার) গায়েব হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মদের ব্যবসার আড়ালে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি এবং কানাডায় অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) সুনির্দিষ্ট অভিযোগ খতিয়ে দেখছে এনবিআর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

 

সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযানকে নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া বলা হয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, হামলার বিচার চাওয়া এবং সরকারের সমালোচনার ঠিক পরেই এই অভিযানের সময় কাকতালীয় কি না। তাঁদের মতে, ভুক্তভোগী নিজেই যদি আইনি চাপের মুখে পড়েন, তাহলে অন্য নাগরিকেরা অভিযোগ জানাতে সাহস পাবেন না।

সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে বড় প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে: যে দেশে একটি প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যও নিজের স্টুডিওতে হামলার বিচার চেয়ে স্বস্তি পান না, সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

Visited 3 times, 3 visit(s) today