মেধা-যোগ্যতায় বিসিএসে সুপারিশ পেয়েও গোপালগঞ্জের বলে ভেরিফিকেশনে ৯ প্রার্থী বাদ

মেধা-যোগ্যতায় বিসিএসে সুপারিশ পেয়েও গোপালগঞ্জের বলে ভেরিফিকেশনে ৯ প্রার্থী বাদ
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


৪৯তম বিশেষ বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পেয়েছিলেন গোপালগঞ্জের ১১ জন প্রার্থী। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত নিয়োগের গেজেটে তাদের মধ্যে মাত্র দুজনের নাম এসেছে। বাকি নয়জন ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন।

বাদ পড়া প্রার্থীদের অভিযোগ, তারা বা তাদের পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। কারও বিরুদ্ধে মামলা নেই বলেও তারা দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, শুধু গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় তারা নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে কোন কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারি কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে ৬১১ জনকে ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য ৬৬৮ জনকে সুপারিশ করেছিল সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। অর্থাৎ সুপারিশপ্রাপ্ত ৫৭ জন শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পাননি।

বাদ পড়া নয়জন হলেন মো. নূরনবী শেখ, আহম্মদ উল্লাহ, সোহাগ মণ্ডল, বিপ্লব বাড়ৈ, শেখ আরাফাত কবির, বুশরা জাহান ঐশী, মো. সাজ্জাদ হোসেন, শফিকুল ইসলাম ও মো. রাকিবুল ইসলাম।

প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের কয়েকজন নিজ নিজ বিভাগে ভালো ফল করেছিলেন। নূরনবী শেখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভাগে তার মেধাক্রম ছিল পঞ্চম।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আহম্মদ উল্লাহ ছিলেন বিভাগে প্রথম। একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের সোহাগ মণ্ডলের মেধাক্রম ছিল তৃতীয়।

বিপ্লব বাড়ৈ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ওই বিভাগে তার মেধাক্রম ছিল পঞ্চম। ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শেখ আরাফাত কবিরের মেধাক্রম ছিল ১৫তম। ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের বুশরা জাহান ঐশীর মেধাক্রম ছিল ১৪তম।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সাজ্জাদ হোসেনের মেধাক্রম ছিল ৩০তম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শফিকুল ইসলামের মেধাক্রম ২৫তম এবং অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের রাকিবুল ইসলামের মেধাক্রম ৩৭তম।

বাদ পড়ার কারণ জানেন না প্রার্থীরা

বাদ পড়া প্রার্থীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ভেরিফিকেশনের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়োগের গেজেটে নাম না থাকায় তারা কারণ জানতে পারেননি।

নূরনবী শেখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, তিনি জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার নিরাপত্তায় রাতভর পাহারায় ছিলেন। তার প্রশ্ন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থেকেও শুধু গোপালগঞ্জের মানুষ হওয়ার কারণে তারা সরকারি চাকরিতে বঞ্চিত হয়েছেন কি না।

আহম্মদ উল্লাহ বলেন, ২০১৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন। এর আগে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে তিনি মেধাক্রমে প্রথম ছিলেন।

আহম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের জেলার নয়জন বাদ পড়েছেন। দুজনকে নেওয়া হয়েছে। ওই দুজনের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে অন্য জেলায় বসবাস করতেন। আমার মনে হচ্ছে, গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার কারণেই ভেরিফিকেশনে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

তার ভাষ্য, তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। পরিবারের কেউ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেন।

রাকিবুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তার বাবা দিনমজুর ও কাঠমিস্ত্রি। তার বাবা কখনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলেও তিনি দাবি করেন। তাকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গোপালগঞ্জের দুজনের নাম গেজেটে

৪৯তম বিশেষ বিসিএসে গোপালগঞ্জ থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত ১১ জনের মধ্যে দুজনের নাম নিয়োগের গেজেটে এসেছে। তাদের একজন তন্ময়। তিনি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) ক্যাডারে মেধাক্রমে ২১তম হয়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তন্ময়ের বাবা শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। তন্ময়ের জন্মের পর তার বাবার গোপালগঞ্জে কর্মস্থল ছিল না। তিনি স্কুল ও কলেজজীবন ঝিনাইদহে কাটিয়েছেন। পরে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) পড়াশোনা করেন।

অপরজন মো. অপু খান। তিনি ম্যানেজমেন্ট ক্যাডারে মেধাক্রমে ষষ্ঠ হয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। পারিবারিক সূত্রের দাবি, অপুও গোপালগঞ্জে বসবাস করতেন না। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তিনি ফরিদপুরে বসবাস ও পড়াশোনা করেছেন।

এ কারণে গোপালগঞ্জের বাদ পড়া প্রার্থীদের কয়েকজন মনে করছেন, তারা গোপালগঞ্জে বসবাস না করায় দুজন গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তবে তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশনে কী ধরনের তথ্য বিবেচনা করা হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারি কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

৫৭ জনের নিয়োগ হয়নি

৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের সময় ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য ৬৬৮ জনকে সুপারিশ করেছিল পিএসসি। প্রায় ১০ মাস পর প্রকাশিত গেজেটে তাদের মধ্যে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে সুপারিশপ্রাপ্ত ৫৭ জনের নাম গেজেটে নেই।

সাধারণত সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আগে প্রার্থীদের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হয়। এ যাচাইয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা, পারিবারিক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্যের পাশাপাশি সরকারের নির্ধারিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী কেন ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন, তা সাধারণত প্রকাশ করা হয় না।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের একজন উপসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে ভেরিফিকেশন একটি ধাপ। এ ধাপে সব সময়ই কিছু প্রার্থী বাদ পড়েন। কে বা কারা বাদ পড়েছেন, কী কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তা বলা বা প্রকাশ করা হয় না। এটি গোপনীয়।’

তিনি বলেন, সরকারের নীতি ও নির্দেশনা অনুসরণ করেই ভেরিফিকেশনের কাজ করা হয়। বাদ পড়া প্রার্থীদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে আবার গেজেটের মাধ্যমে নিয়োগ পেতে পারেন বলেও জানান তিনি।

তবে গোপালগঞ্জের নয় প্রার্থী ঠিক কোন কারণে নিয়োগের গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি।

Visited 14 times, 1 visit(s) today