❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের দ্রুত সামরিক অগ্রযাত্রায় মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে নতুন করে পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর বাড়ছে চাপ। ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে একের পর এক কৌশলগত এলাকা দখলে নেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে হুথিরা মোখা বন্দরনগরী এবং দক্ষিণ লোহিত সাগরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মোখা বাব আল-মান্দাব প্রণালির উত্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথের প্রায় ১২ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের রাজধানীসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ইরান তাদের আর্থিক, কৌশলগত ও পরামর্শমূলক সহায়তা দিয়ে আসছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হুথিরা নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও গড়ে তুলেছে।
পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হুথিরা প্রচলিত স্থলবাহিনী ও পদাতিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে। তাদের হাতে দীর্ঘ ও মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সক্ষমতাও রয়েছে।
হুথিদের অগ্রযাত্রা সৌদি আরবের জন্যও বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল রপ্তানিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনেও আঘাত হানতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইলেও ওয়াশিংটন সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আরেকটি সামরিক ফ্রন্টে জড়াতে অনিচ্ছুক বলে সেখানে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তাকে শুধু সৌদি আরবের নয়, ইউরোপ, চীন, ভারতসহ এই নৌপথ ব্যবহারকারী অন্যান্য দেশেরও স্বার্থের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংকটটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আলোচনায় ওঠার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পক্ষ জড়িত থাকায় সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
সংঘাতের মানবিক প্রভাবও ক্রমেই গুরুতর হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেন থেকে এক লাখের বেশি মানুষ প্রতিবেশী জিবুতিতে পাড়ি দিয়েছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সংকটে থাকা দেশটিতে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাব আল-মান্দাব দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকা থেকে আরব উপদ্বীপে যাওয়ার একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনপথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এদিকে সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজারেও পড়ছে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পাশাপাশি আঞ্চলিক আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ শুধু হুথিদের মোকাবিলা বা একটি নির্দিষ্ট নৌপথের নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির দিকে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।
