বিশেষ প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের এক সমাবেশের ভাইরাল ভিডিওতে কয়েকজন নিজেদের সাবেক সেনা বলে দাবি করে ‘৩-৪ দিনের মধ্যে কোলকাতা দখল’ করার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই ভিডিও তখন ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের কিছু অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আইনশৃঙ্খলার রক্ষক না হয়ে প্রতারক ও ডাকাত চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে অস্ত্রের মুখে এক ব্যবসায়ীর ৩৮ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য। পুলিশ বলছে, এ চক্রে বর্তমান এক সেনা সদস্যও আছেন, যার বিষয়ে তার বাহিনীকে অবগত করা হয়েছে।
রোববার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসে এ ডাকাতির ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন।
গ্রেপ্তাররা হলেন—তানভীর আবেদীন (৪১), মজিবুর রহমান (৬০), জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির (৬০), সোলায়মান মৃধা (৫৫), মোহাম্মদ কবির হোসেন (৫০), আবুল কালাম আজাদ (৫০), জাকারিয়া হোসেন ওরফে লেলিন (৪০), সজল চৌধুরী (৩১) ও সায়মুন চৌধুরী (৩৩)।
এদের মধ্যে দুজনকে ঘটনার সময় হাতেনাতে এবং বাকিদের দক্ষিণখান, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড, মোহাম্মদপুর, বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ধরা হয়।

সাবেক সেনা সদস্যদের বিষয়ে যুগ্ম কমিশনার ফারুক হোসেন বলেন, “মজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। মোহাম্মদ জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির সেনাবাহিনীর অনারারি ক্যাপ্টেন পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। আর সোলায়মান সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার পদ থেকে অবসর নিয়েছেন।” তাদের মধ্যে কেউ কেউ এক সময় র্যাবে কর্মরত ছিলেন বলেও জানান তিনি।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ চক্রে শফিক নামে সেনাবাহিনীর একজন ল্যান্স করপোরালও রয়েছেন। ধানমন্ডি থানার ওসি মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম বলেন,
“আমরা তার বিষয়ে সেনাবাহিনীকে অবহিত করেছি, মামলার যাবতীয় নথিও পাঠিয়ে দিয়েছি। তার বিরুদ্ধে হয়তো তারা সেনা আইনে ব্যবস্থা নেবে, তবে তাকে এখনো আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।”
গত ৩০ আগস্ট দুপুরে ধানমন্ডি ১২ নম্বর সড়কে ডিঙ্গি রেস্তোরাঁর সামনে খোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ৩৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় ৮-১০ জনের একটি দল। পালিয়ে যাওয়ার সময় ধানমন্ডি মডেল থানা পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তানভীর আহমেদ জুয়েল ও মজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে চার রাউন্ড গুলিসহ একটি রিভলভার উদ্ধার করা হয়।
পরে মজিবুর ও তানভীরের দেওয়া তথ্যে দক্ষিণখান থেকে জাকিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পর্যায়ক্রমে বাকিদের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম কমিশনার ফারুক বলেন, “গ্রেপ্তার জাকারিয়ার কাছ থেকে লুট হওয়া ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫০ টাকা এবং সজল চৌধুরীর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।” সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫০ টাকা উদ্ধার হয়েছে। চক্রে জড়িত পলাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তানভীরের বিরুদ্ধে চারটি এবং সজলের বিরুদ্ধে ছয়টি ডাকাতি ও ছিনতাই মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। জাকারিয়ার বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যাচেষ্টার দুটি মামলা রয়েছে।
২০২৪ সালে যারা ‘কোলকাতা দখল’ নিয়ে বড় বড় কথা বলেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রতারক ও ডাকাত হিসেবে পরিচিত হচ্ছেন। যারা একসময় দেশ রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন, তারা এখন সোনা বা টাকার লেনদেনের ফাঁদ পেতে অস্ত্রের মুখে অর্থ লুট করছেন—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।
