বিশ্লেষণ || ২০২৪-এর আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের মানবিক বিপর্যয়সমূহ

বিশ্লেষণ || ২০২৪-এর আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের মানবিক বিপর্যয়সমূহ
শেয়ার করুন

– ড. মামুনুর রশীদ

২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, শিল্পখাতে কর্মসংস্থান হ্রাস, জনস্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ু দুর্যোগ পরস্পরকে আরও তীব্র করেছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে এবং এর প্রভাব বিশেষভাবে শিশু, নারী, শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর পড়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জলবায়ুজনিত কারণে শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ও আটক পরিস্থিতিও গুরুতর ছিল। ঢাকায় ৭০৭টি মামলার ভিত্তিতে ৫,০৭৯ জনের বেশি ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের দাবি অনুযায়ী গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৪ লাখের বেশি, এবং ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩০,০০০ ব্যক্তি হেফাজতে থাকার দাবি করা হয়।

শিল্পখাতে সংকটের প্রভাব ছিল আরও বিস্তৃত। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে ৫০০টির বেশি রপ্তানিমুখী বড় কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যেই ৩০০টির বেশি বন্ধ হওয়ার তথ্য রয়েছে। পোশাক রপ্তানি আয় প্রায় ১২ শতাংশ কমে ৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেক্সিমকো গ্রুপে প্রায় ৪০,০০০ শ্রমিকের ছাঁটাই এবং চামড়া খাতে ৮০টি কারখানা বন্ধের তথ্যও উল্লেখযোগ্য। ঢাকার সিরামিক শিল্পে ১০০টির বেশি কারখানা বা উৎপাদন ইউনিট বন্ধ বা স্থবির হয়েছে।।

এই শিল্প সংকট নারীদের ওপর অসম প্রভাব ফেলেছে। তৈরি পোশাক খাতে কর্মীসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ নারী, অথচ মোট চাকরি হারানোর প্রায় ৯০ শতাংশই নারী বলে প্রদত্ত তথ্য ইঙ্গিত করে। ফলে শিল্পখাতের সংকট একই সঙ্গে নারী কর্মসংস্থান ও পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে।

জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হাম বা মিজলসের প্রাদুর্ভাব বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সন্দেহভাজন বা নিশ্চিত হিসেবে ৯১৫ জনের বেশি শিশুমৃত্যু, ১,৩১,৯৪৬টি সন্দেহভাজন এবং ১৬,৫৩১টি নিশ্চিত আক্রান্তের তথ্য দেওয়া হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলাতেই এর বিস্তার ঘটেছে এবং নিয়মিত টিকাদান কভারেজ বছরে প্রায় ৪–৫ শতাংশ কমেছে।

শিশু নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী সাত মাসে শিশু অপহরণ সংক্রান্ত প্রায় ১৫,০০০টি সাধারণ ডায়েরি (GD) নথিভুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটও তীব্র। ৮৬.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী গুরুতর উদ্বেগ বা বিষণ্নতাজনিত মানসিক সমস্যার কথা জানিয়েছে। এর পাশাপাশি ৩৮.০৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মাঝে মাঝে এবং ২৯.৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিতভাবে কোনো না কোনো আন্দোলনে অংশ নিয়েছে।

দারিদ্র্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের শেষ রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৬ কোটির অধিক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্যের সীমার মধ্যে আছে।

সবশেষে, জলবায়ু দুর্যোগ এই সংকটগুলোকে আরও গভীর করেছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার কারণে ন্যূনতম প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। ২০২৪ সালে বড় ধরনের ৪টি জলবায়ু দুর্যোগে ১ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় প্রায় ৪৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বন্যায় প্রায় ৭০ লাখ শিশুসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্যোগজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ, আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত তিন দশকে গড়ে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যায় ৭১ জনের মৃত্যুও নথিভুক্ত হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, এসব তথ্য দেখায় যে সেপ্টেম্বর ২০২৪-পরবর্তী সংকটটি কোনো একক খাতের সমস্যা নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, কর্মসংস্থান হ্রাস, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশুনিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু দুর্যোগ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

Visited 319 times, 1 visit(s) today