নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি, কেউ বিদেশে অবস্থান করা, কেউ কারাগারে থাকা এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটাই থমকে আছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমানে মাঠে নেই। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াদুদ দারা, যিনি রাজশাহী-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। ফলে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের দুজনের কেউই বর্তমানে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সক্রিয় নেই।
মহানগর আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও প্রায় একই পরিস্থিতি। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির নিয়মিত সাংগঠনিক তৎপরতা চোখে পড়ছে না। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাজনীতির বাইরে আছেন বলে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ।
অন্যদিকে মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ফলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ বলছে, শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও আগের মতো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। নিয়মিত সভা, কর্মসূচি, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে।
শোকসভা ঘিরে দুই বলয়ের আলাদা অনলাইন বৈঠক
রাজশাহী জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয় ১০ আগস্ট আয়োজিত একটি শোকসভায়। জেলা আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই শোকসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন।
ওই অনুষ্ঠানে রাজশাহীর বিভিন্ন আসনের সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যদের বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তাঁদের কেউই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
আমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন রাজশাহী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন, রাজশাহী-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ দারা, রাজশাহী-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম এবং রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ।
আর রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার কারাগারে থাকায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দাবি করেছেন, আমন্ত্রিতদের অনুপস্থিতির পেছনে বিভিন্ন কারণের কথা বলা হলেও আসলে বিষয়টি রাজশাহী আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে রাজশাহীর কয়েকজন নেতা-কর্মী উপস্থিত থাকলেও নির্বাচিত বা সাবেক জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ সেখানে ছিলেন না। এর প্রধান কারণ রাজশাহীর সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে জেলা ও মহানগরের নেতাদের দ্বন্দ্ব।
দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, ১০ আগস্টের অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিদের বলয় এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের বলয়ের কর্মীরা ২১ আগস্ট পাল্টা আরেকটি অনলাইন কর্মসূচির ডাক দেন।
সেখানে প্রধান অতিথি থাকার কথা ছিল আওয়ামী লীগের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং প্রধান বক্তা ছিলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তবে তারা কেউই উপস্থিত ছিলেন না।
এই কর্মসূচিতে ছিলেন রাজশাহী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন, রাজশাহী-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম এবং রাজশাহী-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ দারা।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াদুদ দারা, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের বলয়ের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে কারাগারে থাকা রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও রাজশাহী-৩ আসনের আসাদুজ্জামান আসাদের বলয়ের নেতাকর্মীরাও এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সারাদেশে মিছিল হলেও রাজশাহীতে নেই কোনো কর্মসূচি
মহানগরীর আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ এক নেতা বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, খায়রুজ্জামান লিটন ৫ আগস্টের পরে কোনো কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন না, এমনকি কোনো নেতাকর্মীরও খোঁজ নেননি। এজন্য তার ডাকে কেউ আসছে না।
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপের উল্লেখ করে রাজশাহী ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ এক নেতা বিডি ডাইজেস্ট বলেন, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতে খায়রুজ্জামান লিটনের কন্যা অর্ণার অযাচিত হস্তক্ষেপ ও ৫ আগস্টের পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনুপস্থিত থাকায় নেতাকর্মীদের একটা অংশ ক্ষুব্ধ। এজন্য লিটন ভাই রাজশাহীর একক নেতা হয়ে উঠলেও তার ডাকে কেউ আসছেন না।
মহানগর আওয়ামী লীগের এক কার্যনির্বাহী সদস্য বলেন, সারাদেশে গ্রুপিংয়ের দিক থেকে বোধহয় রাজশাহী সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। এজন্য রাজশাহীতে সর্বত্র গ্রুপিং, কোথাও কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। নেতারাও কর্মীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না, ফলে সারাদেশে মিছিল-মিটিং হলেও রাজশাহী মহানগর কিংবা জেলায় কোনো মিছিল-মিটিং হচ্ছে না।
এ বিষয়ে রাজশাহী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী গ্রুপিংয়ের কথা বিডি ডাইজেস্টের কাছে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো গ্রুপিং নেই। শেখ হাসিনার প্রশ্নে আমরা সবাই এক। একসাথেই কাজ করছি।
অন্যদিকে এসব বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খায়রুজ্জামান লিটনকে বিডি ডাইজেস্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
একই সঙ্গে রাজশাহী-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, সব জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, প্রতিযোগিতা ছিল ফলে কিছু মনোমালিন্যও ছিল। এজন্য যার যার এলাকায় নিজেদের মতো কর্মসূচী করেছেন তবে পাল্টাপাল্টি কোন কর্মসূচী হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি সব মনোমালিন্য দূরে রেখে দলকে ঐক্যবদ্ধ করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
