গ্যাস সংকটে স্থবির চট্টগ্রাম, উৎপাদন ব্যাহত শিল্পে, ভোগান্তিতে লাখো গ্রাহক

গ্যাস সংকটে স্থবির চট্টগ্রাম, উৎপাদন ব্যাহত শিল্পে, ভোগান্তিতে লাখো গ্রাহক
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে নগরের বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি স্টেশনগুলোর কার্যক্রমও চাপে পড়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে নগরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

রোববার সরেজমিনে কদমতলীর ফোর স্টার সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাকলিয়ার কর্ণফুলী ফিলিং স্টেশন এবং মাইজ্জারটেক এলাকার একাধিক স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালক কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাননি।

কদমতলীর একটি সিএনজি স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ কাফিল উদ্দিন বলেন, আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস পাওয়া যেত। কয়েক দিন ধরে অপেক্ষার সময় বাড়লেও এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

চাহিদার তুলনায় ১৪ কোটি ঘনফুট কম গ্যাস

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত কেজিডিসিএল পেয়েছে প্রায় ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস, যেখানে দৈনিক চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সরবরাহ আরও কমে ২০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাসাবাড়ি ও শিল্পে একসঙ্গে সংকট

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। নগরের হালিশহর এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, কয়েক দিন ধরে দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না। সন্ধ্যার পর এলেও চাপ এত কম থাকে যে রান্না করা যায় না। অনেক সময় গভীর রাতে সামান্য গ্যাস পাওয়া যায়। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।

সংকট সামাল দিতে বড় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং অন্যান্য বৃহৎ গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছে কেজিডিসিএল। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটের পরিবর্তে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট, সার কারখানায় ৪৮ মিলিয়নের পরিবর্তে ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ইউনাইটেড পাওয়ারে ১৩ মিলিয়নের পরিবর্তে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

এর ফলে পতেঙ্গা, ইপিজেড, কালুরঘাট, অক্সিজেন ও সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় বয়লার ও জেনারেটর পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ওয়াশিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক মো. রকি উদ্দিন রিপন বলেন, ওয়াশিং কারখানাগুলো পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর। শনিবার রাত থেকে কার্যত গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ মেশিন বন্ধ রাখতে হয়েছে। সকাল ১০টার পর সামান্য গ্যাস এলেও স্বাভাবিক উৎপাদন সম্ভব হয়নি। তাঁর কারখানার ছয়টি মেশিনের মধ্যে মাত্র দুটি চালানো গেছে। উৎপাদন সক্ষমতার ৩৫ শতাংশের বেশি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের প্রায় ৫০টি ওয়াশিং কারখানাই একই সংকটে রয়েছে।

বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে ইস্পাত শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে তেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারমূল্যের ওপরও পড়তে পারে।

দেশজুড়ে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি

গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। দৈনিক চাহিদা ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ সেই তুলনায় অনেক কম।

তিনি বলেন, সব খাতে ন্যূনতম গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা বা চাপ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নজরুল ইসলাম জানান, সংকটের মূল কারণ মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ড। টার্মিনালের দুটি বয়লারের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমস্যার সমাধানে কাজ করছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Visited 9 times, 1 visit(s) today