বিশেষ প্রতিবেদক
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী সাম্প্রতিক এক সরকারি সংবাদ সম্মেলনে আফগান তালেবান সরকারের এক মন্ত্রীর ভারত-আফগানিস্তান সম্পর্ক নিয়ে করা মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সরাসরি কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন, যা এখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
যা ঘটেছিল
ভারত-আফগানিস্তান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আফগান মন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জেনারেল চৌধুরী বলেন, ভারত ও হিন্দুদের সঙ্গে এমন নৈকট্য দাবি করার মধ্য দিয়ে ইসলামি নীতিমালা মেনে চলার প্রশ্ন উঠে যায়। তিনি তালেবান প্রশাসন ও সাধারণ আফগান জনগণের মধ্যে পার্থক্য টানার চেষ্টা করেন, বলেন সাধারণ আফগানরা তালেবান শাসনে ভুগছে এবং তাদের শাসকদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
এরপর তিনি তালেবান শাসনের সমালোচনা করে বলেন, নারী ও শিশুদের প্রতি তাদের আচরণ এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অনুমতি দিয়ে জারি করা ধর্মীয় ফতোয়ার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এই বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় তিনি একটি কোরআনি আয়াত উল্লেখ করেন, যাতে বলা হয়েছে মুসলিমদের কাফেরদের বন্ধু বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয় বলে তিনি দাবি করেন। তিনি যুক্তি দেন যে বিষয়টি আফগান মন্ত্রীর “ডিএনএ” সংক্রান্ত মন্তব্যের চেয়েও গভীর। এছাড়া তিনি তালেবান সরকার ও ভারতের বিজেপি-আরএসএসের সম্পর্ককে “প্রভু ও দাসের” সম্পর্ক বলে বর্ণনা করেন এবং তালেবানকে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করার অভিযোগ আনেন।
ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ
একই সংবাদ সম্মেলনে জেনারেল চৌধুরী ভারতের বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগগুলোও নতুন করে তুলে ধরেন — বিশেষত আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অভিযোগ। এসব অভিযোগ ভারত বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। প্রসঙ্গত, চৌধুরী অতীতেও ভারতের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলেছিলেন, যা আফগান তালেবান সরকার ও ভারত সরকার উভয়েই অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চৌধুরীর এই সাম্প্রতিক মন্তব্য পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট থেকে দৃষ্টি সরানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার মধ্যে রয়েছে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে জঙ্গি হামলা বৃদ্ধি এবং চীন-সমর্থিত সিপিইসি প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। এছাড়া, পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমানভাবে “ফিতনা আল-হিন্দুস্তান” জাতীয় শব্দ ব্যবহার একটি রাজনৈতিক ও আইনি বয়ান তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যাকে ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল অভ্যন্তরীণ সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণকে যৌক্তিক করার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা সংকটের দায় বাইরে ঠেলে দেওয়ার লক্ষ্যে করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর ইসলামীকরণ: দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ মুখপাত্রের মুখে সরাসরি ধর্মীয় আয়াত উদ্ধৃত করে ভূরাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার ঘটনা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামল থেকে শুরু হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও প্রকাশ্য বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ফেলে আসছে বলে বিভিন্ন সময়ে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন। একজন উচ্চপদস্থ আইএসপিআর কর্মকর্তার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে আয়াত উদ্ধৃত করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে “কাফের-মুসলিম” বিভাজনের ভাষা ব্যবহার করাকে অনেকে সামরিক প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয়করণের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জেনারেল চৌধুরীর ব্যক্তিগত পারিবারিক প্রেক্ষাপটও এক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে — তাঁর পিতা সুলতান বশিরউদ্দিন মাহমুদ, যিনি পাকিস্তান পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ছিলেন, কোরআনের প্রথমাংশের একটি “বৈজ্ঞানিক তাফসির”সহ ধর্মীয় বিষয়ে একাধিক বই লিখেছেন।
সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য বক্তব্যে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে — কেউ কেউ মনে করেন এটি নিছক কূটনৈতিক বাগাড়ম্বর, আবার কেউ কেউ একে প্রাতিষ্ঠানিক নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তান সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা এখনো আসেনি।
