কেপ ভার্দের রূপকথার মতো পথচলাকে থামিয়ে দেওয়ার আগে বড় ধরনের ধাক্কাই খেয়েছিল আর্জেন্টিনা। তবে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে লিওনেল মেসির ২০তম বিশ্বকাপ গোলের পর শেষ মুহূর্তের আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানের জয় নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে লা আলবিসেলেস্তেরা।
চলতি টুর্নামেন্টে চার ম্যাচে নিজের সপ্তম গোলটি করার পথে মেসির দারুণ নিয়ন্ত্রণ ও ফিনিশিং বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের চালকের আসনে বসিয়েছিল। তবে দমে যেতে অস্বীকৃতি জানায় ‘ব্লু শার্কস’ খ্যাত কেপ ভার্দে। ম্যাচের ৬০ মিনিটে ডেরয় ডুয়ার্টের গোল আর্জেন্টিনাকে মিয়ামির ক্লান্তিকর গরমের মধ্যে ধারণার চেয়েও বেশি শক্তি ক্ষয় করতে বাধ্য করে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেস কিছুক্ষণের জন্য আর্জেন্টিনার লিড পুনরুদ্ধার করলেও সিডনি লোপেস কাবরালের চমৎকার শটটি পোস্টের ওপরের কোণ দিয়ে জালে জড়ায়। আর্জেন্টিনার আরেকটি কর্নার শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ করে। মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো সবার উপরে লাফিয়ে উঠে হেড করেন এবং বলটি ডিনে বোর্জেসের গায়ে লেগে আত্মঘাতী গোল হিসেবে জালে প্রবেশ করে।
আগামী মঙ্গলবার আটলান্টায় মিশরের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। তবে তুলনামূলক সহজ ড্র মনে হলেও, কোচ হিসেবে নিজের ১০০তম ম্যাচে লিওনেল স্কালোনির জন্য কিছু উদ্বেগের কারণ রয়ে গেছে।
গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবকে ড্রয়ে আটকে দিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছিল কেপ ভার্দে; যার মাধ্যমে তারা আগেই নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়ে রেখেছিল। ব্লু শার্কসের কোচ বুবিস্তা বলেছিলেন, মেসি ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে ম্যাচটি হবে ‘তাদের জীবনের সেরা ম্যাচ’ এবং মাঠের লড়াকু পারফরম্যান্সে তার প্রমাণও মিলেছে, যা আর্জেন্টিনাকে ১২০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে ঘামাতে বাধ্য করেছে।
বর্তমানে ইন্টার মিয়ামির হয়ে যেখানে ক্লাব ফুটবল খেলছেন, সেই চেনা শহরে ফেরার পর আকাশি-সাদা জার্সিতে ছেয়ে যাওয়া প্রায় ৬৫,০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে মেসির প্রতিটি মুভমেন্টকে ঈশ্বরের মতো অভিবাদন জানানো হচ্ছিল। ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা হালকা ছোঁয়ায় চমৎকার এক জাদুর মুহূর্ত তৈরি করেন এবং গোলরক্ষক ভোজিনহাকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠিয়ে খাতা খোলেন। এর মাধ্যমে মেসি টানা আটটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার নিজের রেকর্ডটিকে আরও বাড়িয়ে নিলেন। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়ে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের চেয়ে আবারও দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে গেলেন।
প্রথমার্ধে এমি মার্তিনেসকে প্রায় অলস সময়ই কাটাতে হয়েছিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দে আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে খেলা শুরু করলে অ্যাস্টন ভিলার এই গোলরক্ষক ডুয়ার্টের একটি শট দারুণভাবে রুখে দিতে বাধ্য হন। এর কিছুক্ষণ পরেই রায়ান মেন্দেসের পাস থেকে ডুয়ার্টের নেওয়া নিছু শটটি দূরের কোণ দিয়ে জালে জড়ালে মার্তিনেসের কিছুই করার ছিল না।
গত মাসে স্পেনের বিরুদ্ধে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্সের পর কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা ইন্টারনেট সেনসেশনে পরিণত হন। আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি যখন আর্জেন্টিনার লিড পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রায় নিশ্চিত ছিলেন, তখন তার সঙ্গে ওয়ান-অন-ওয়ান লড়াইয়ে জিতে যান ভোজিনহা; যা তার ইনস্টাগ্রামের প্রায় ১৮ মিলিয়ন অনুসারী বেশ উপভোগ করেছেন। এরপর কেপ ভার্দের পরবর্তী নায়ক ছিলেন আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী পিকো লোপেস। মেসির আরেকটি জাদুকরি পাস থেকে এনসো ফের্নান্দেস যখন সহজ গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন, তখন পিকো লোপেস গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ করে তা নস্যাৎ করে দেন।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে কর্নার থেকে বল পেয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের জোরালো শট আর্জেন্টিনাকে আবারও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যায় বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এবারও কেপ ভার্দে হার মানতে রাজি হয়নি। লোপেস কাবরালের নেওয়া টুর্নার্মেন্টের অন্যতম সেরা এক শট টপ কর্নার দিয়ে জালে জড়ালে ম্যাচে সমতা ফেরে। গোল উদযাপনের জন্য এই ফুলব্যাক গ্যালারির দিকে ছুটে যান তার সঙ্গিনীর সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে।
গ্যালারির অন্য প্রান্তের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ, যা পুরো সন্ধ্যার বেশির ভাগ সময় জুড়েই ছিল, পেনাল্টি শুট-আউটের সময় ঘনিয়ে আসায় তা এক স্নায়বিক উত্তেজনায় রূপ নেয়। মেসির কর্নার থেকে দুর্ভাগ্যবান বোর্জেসের আত্মঘাতী গোলের পর স্কালোনি কেবল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছতে পেরেছিলেন।
তবুও ক্লান্ত আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্তের কয়েক সেকেন্ডে কেপ ভার্দের তীব্র আক্রমণ থেকে বাঁচতে ভাগ্যের ওপর ভরসা করতে হয়েছিল। এবার এমি মার্তিনেস টপ কর্নারের দিকে ছুটে যাওয়া লোপেস কাবরালের আরেকটি চমৎকার শটকে লাফিয়ে উঠে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করে সেই লড়াইয়ে জয়ী হন।
