❐ আয়নাল কারিগর
সারাদেশ পরিণত হয়েছে খুন-ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-অপহরণসহ সকল ধরনের অপরাধের এক স্বর্গরাজ্য। বিশেষ করে ২০২৪-এর ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত মব সন্ত্রাস, সহিংসতা, অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হয়নি। নারী ও শিশু ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে গড়ে দিনে ১০টির বেশি খুন হচ্ছে। নদীগুলো হয়েছে লাশের ডাম্পিং স্টেশন। এমন কোনো দিন নেই যেদিন কোনো নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে না। বাদ যাচ্ছেনা মসজিদ-মাদ্রাসার মত স্থানগুলোও।
এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বরং জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে এবং পরবর্তীতে কারাগার ভেঙে জঙ্গি-দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেওয়া, ফাঁসির সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তি দেওয়া, দুর্ধর্ষ অপরাধীদের মুক্তি দেওয়ার ঘটনা এমন পরিস্থিতির পেছনে দায়ী বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
কিন্তু এত কিছুর পরেও ভ্রুক্ষেপ ছিল না ইউনূস সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার, নেই বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও। বরং তাদের তৎপরতা দৃশ্যমান কেবল আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, এমন দাবি নগরবাসীর। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের চেয়ে সরকারের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে নির্মূল করা।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন ক্রমশ বেড়ে চলেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে, ঠিক সেসময় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে ‘ব্যাপক প্রস্তুতি’ নেওয়ার কথা জানাল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
আগামীকাল ২৩শে জুন, মঙ্গলবার দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ থাকবে বলে ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। এছাড়া, ঢাকার দুই শতাধিক জায়গায় পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট বসানোর কথাও আছে বিজ্ঞপ্তিতে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে অরাজকতা হতে পারে, সরকারপক্ষীয় বিভিন্ন সূত্র এমন দাবি করছে কয়েক দিন ধরেই।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ‘জরুরি বার্তা’ মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়। তাতে সারাদেশে পুলিশকে ‘প্রয়োজনীয় সতর্কতার’ পাশাপাশি ‘নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা’ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া আছে।
জরুরি বার্তায় বলা হয়, মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে। ফলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে ‘সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে’।
তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর ‘ক্ষুব্ধ হতে পারে’ বলেও আশঙ্কা করা হয়। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে আলোচনার মধ্যে গতকাল ২১শে জুন, রোববার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ২৩শে জুনকে কেন্দ্র করে ‘ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতির’ কথা বলল ডিএমপি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএমপির জানায়, ২৩শে জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ডিএমপি। বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং নগরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে পুরো ঢাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মঙ্গলবার ডিএমপির বিশেষায়িত ইউনিটগুলোও মাঠে থাকবে। এর মধ্যে ডিবি এবং সিটিটিসি ইউনিট সার্বক্ষণিক মোতায়েন রাখার পাশাপাশি যেকোনো আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং আইএডি (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন) ব্যাপক গোয়েন্দা কার্যক্রম চালাবে।
ডিএমপি জানিয়েছে, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে মহানগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হবে। এছাড়া ঢাকার ৪টি প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত ফোর্স স্ট্যান্ডবাই বা রিজার্ভ রাখা হবে, যেন ডাক পাওয়া মাত্রই তারা অ্যাকশনে যেতে পারে।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের সংঘাতের পর ৫ই আগস্ট দেশত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর ৩ দিন পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে একে একে গ্রেপ্তার করা হয় আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্যরা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকা অন্যদলগুলোর নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়।
মব সন্ত্রাস ও জঙ্গি হামলা চালিয়ে কয়েক হাজার আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যা করা হয় সারাদেশে। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, ভেঙে-গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের আওয়ামী লীগের সকল রাজনৈতিক কার্যালয়। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এমনকি সমর্থকদের বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পাশাপাশি চালানো হয় লুটতরাজ।
হত্যা-ধর্ষণের খড়গ নেমে আসে তাদের ওপর। ভুয়া ও ভিত্তিহীনের মামলা ছাড়াও মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চলছে হয়রানি। পুলিশ হেফাজতে এবং কারাগারে চালানো হচ্ছে নির্যাতন। এখন অব্দি অন্তত দেড় শতাধিক নেতাকর্মীর মৃত্যু ঘটেছে নিরাপত্তা হেফাজতে।
কিন্তু এত কিছুর পরেও দাবিয়ে রাখা যায়নি কর্মীদের। নিয়মিত গ্রেপ্তার-নির্যাতনের শঙ্কা উপেক্ষা করে মিছিল-সমাবেশ করছেন তারা।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে থাকলেও নিয়মিত কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন বড় অংশই। প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে না থাকলেও দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। সারাদিনই তার কাটছে দেশে-বিদেশে নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা এবং দিক নির্দেশনা প্রদানে।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি, হাম মহামারিসহ বিভিন্ন জন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আওয়ামী লীগের কর্মীরা নিয়মিত রাজপথে নামছেন। তাদেরকে দমন করতে চলছে পুলিশি গণ-গ্রেপ্তার, চলছে মব সন্ত্রাস এবং নিপীড়ান। তবুও মিছিল সমাবেশ ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমনকি সাধারণ মানুষের সমর্থনও পাচ্ছেন তারা।
