মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে থাকা কি অপরাধ? বিশ্ব মানবাধিকার সনদের ২৬ ধারা নিয়ে চবি ছাত্রলীগের ক্যাম্পেইন

মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে থাকা কি অপরাধ? বিশ্ব মানবাধিকার সনদের ২৬ ধারা নিয়ে চবি ছাত্রলীগের ক্যাম্পেইন
শেয়ার করুন

❐ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


আজ ২০শে জুন, শনিবার সকাল ঠিক সাড়ে ৭টা। ক্যাম্পাস যখন মাত্র জাগতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ১ নম্বর গেটের সামনে আকস্মিক প্রতিবাদী ব্যানার ও প্রশ্ন নিয়ে হাজির হন নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা অবস্থায় থাকা ছাত্রলীগের দুই কর্মী।

তীব্র রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতি আর কঠোর নজরদারির মাঝেই নিজেদের ‘শিক্ষার অধিকার’ আদায়ের দাবিতে চবি বাংলা বিভাগের (২০-২১ সেশন) ছাত্র অর্ণব বৈরাগী এবং একই সেশনের আইন বিভাগের ছাত্র মাহমুদুজ্জামান ওমর এই কর্মসূচি পালন করেন।

তাদের হাতের প্রতিবাদী ব্যানারে বিশ্ব মানবাধিকার সনদের স্লোগান তুলে ধরে লেখা ছিল:

UDHR Article 26: Education for ALL, No Exceptions
DON’T LOCK OUR CLASSROOM. STOP MOB-DRIVEN EXPULSIONS.

Education is a fundamental human right, not a charity. We demand our rights, not anyone’s pity.

UNESCO: Uphold Your Creation The UDHR. ACT NOW!

We are guilty of no crime. We may not be graduated for holding our beliefs. But time will come, the Judge will be judged, truth will prevail.

অর্থাৎ, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৬ নং ধারা: সকলের জন্য শিক্ষা, এখানে কোনো ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের শ্রেণীকক্ষ তালা দেবেন না। মব নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার সুযোগ সীমিত করা বন্ধ করুন। শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার, কোনো দান নয়। আমরা আমাদের অধিকার চাই, কারো করুণা নয়।

ব্যানারে ইউনেস্কোর উদ্দেশ্যে আরও বলা হয়— মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র যা রচনা করতে ভূমিকা রেখেছিলেন এখন তা সমুন্নত রাখুন। এখনই পদক্ষেপ নিন! আমরা কোনো অপরাধ করিনি।

“ওরা চড়বে গাড়ি, আর আমরা কাটবো ঘাস?”: অর্ণব বৈরাগীর ক্ষোভ

ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র অর্ণব বৈরাগী বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন।

তিনি বলেন, “ওরা আমাদের ক্লাসরুম আর বই-খাতা কেড়ে নিয়ে ভেবেছে— ওরা বড় হবে, চড়বে গাড়ি, আর আমরা কাটবো ঘাস! সাংবিধানিক নাগরিক অধিকারের কথা বাদই দিলাম, কারণ সেখানে বঙ্গবন্ধুকে সাংবিধানিকভাবে অপমান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই আমরা UDHR-এর ‘Article 26’ মনে করিয়ে দিতে এসেছি। যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাইকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে হবে, কিন্তু আমাদের ক্লাসরুমে যাওয়ার সুযোগটুকুই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”

বর্তমানে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করা শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে অর্ণব আরও বলেন, বুয়েটের শিক্ষার্থীদের শহিদ মিনারে ফুল কিংবা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর অপরাধে প্রকৌশলী হয়ে উঠতে না দেওয়ার চক্রান্ত এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভবিষ্যৎ চিকিৎসকের সনদ আটকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগামী প্রজন্ম মনে রাখবে।

তিনি যোগ করেন, “বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করায় আমাদের শিক্ষাজীবন কারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে, তা সবাই জানে। ৭১ এও তারাই মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে৷ আজ ১ নম্বরে এসেছি, কাল হয়তো জিরো পয়েন্ট এবং পরশু প্রশাসনিক ভবনে যাব, কিন্তু দমে যাব না।”

“ঘাড়ের ওপর আগুনের নিশ্বাস ফেলবো”— ওমরের চরম হুঁশিয়ারি

সমাবেশে আইন বিভাগের ছাত্র মাহমুদুজ্জামান ওমর সরাসরি প্রশাসন কে বাস্তবতা স্বরণ করিয়ে দিতে চরম হুঁশিয়ারি ও একরকম হুমকি দেওয়ার মত করেই বলেন – ২০২৬ সালের ২০শে জুনের এই তারিখটিকে স্মরণীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে মনে করিয়ে দিতে আসলাম—অধিকার ফিরিয়ে না দিলে ভবিষ্যতে আমরা আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিব। যেখানে আমাদের ভাইদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে, যেখানে ছাত্রত্বের হত্যার মিছিল শুরু হয়েছিল, সেখান থেকেই আজ বাংলাদেশের লক্ষ শিক্ষার্থীর অধিকারের পক্ষে দাঁড়ালাম।”

ভবিষ্যতে আন্দোলনের চরম বার্তা দিয়ে ওমর বলেন, “আজ ১ নম্বরে দাঁড়িয়েছি, এরপর দাঁড়াব জিরো পয়েন্টে। খুব দ্রুতই তোমাদের ঘাড়ের উপর আগুনের নিঃশ্বাস ফেলবো।

বহিষ্কারের একরাশ বেদনা: “সাহস আর তীব্র ক্ষোভ”

আন্দোলনকারী দুই ছাত্র অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তাদের ক্ষোভের পেছনের কারণ তুলে ধরেন। তারা বলেন, যেদিন তারা এই চবি গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রবেশ করেছিলেন, সেদিন কথা ছিল শিক্ষা জীবন পরিপূর্ণভাবে শেষ করেই ঘরে ফিরবেন।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে অন্যায়-অন্যায্যভাবে বয়কট, অবাঞ্ছিত এবং বহিষ্কার করে শিক্ষার মতো মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। বহিষ্কৃত ও কোণঠাসা হয়ে পড়া সেসব শিক্ষার্থীর বুকের ভেতর জমা হওয়া একরাশ বেদনার চাপা ক্ষোভকে বিশ্ববাসীর সামনে জানান দিতেই আজকের এই অবস্থান।

সবশেষে তারা বিবৃতি দেন ও অবস্থান ব্যাক্ত করেন — “আমরা আমাদের বিশ্বাস ধারণ করার জন্য হয়তো স্নাতকোত্তর স্বীকৃতি পাব না। কিন্তু আমরা এও বিশ্বাস করি একদিন সময় আসবে, বিচারকেরও বিচার হবে, সত্যের জয় হবে।” এবং “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” ধ্বনি দিয়ে তারা স্থান ত্যাগ করেন।

Visited 5 times, 1 visit(s) today