রাজশাহী মেডিকেলের গবেষণায় ভয়ঙ্কর তথ্য: অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে শিশুদের চিকিৎসায় বিপর্যয়, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি সাত গুণ বেশি
❐ বিশেষ প্রতিবেদক
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার ছিল মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। কোটি কোটি মানুষের প্রাণ রক্ষাকারী এই ওষুধ এখন ক্রমশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে। আর এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের ছোট শিশুরা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক উদ্বেগজনক চিত্র, যা চিকিৎসকমহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গবেষণায় উঠে এল ভয়ঙ্কর তথ্য
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে অর্থাৎ পিআইসিইউতে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন ৪৯টি শিশুর শরীর থেকে জীবাণুর নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।
চিকিৎসাধীন এই শিশুদের শরীরে প্রয়োগ করা ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই আর কোনো কাজ করছে না। এর চেয়েও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, প্রতিটি গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণু প্রধান ছয়টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে।
সহজ কথায়, এই ওষুধগুলো এখন জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কেবল টাইজেসাইক্লিন ও কলিস্টিন নামের দুটি ওষুধ এখনও কার্যকর রয়েছে।
তবে গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, জীবাণু যেভাবে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে তাতে শেষ অস্ত্র হিসেবে পরিচিত কলিস্টিনও অচিরেই কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলতে পারে।
সুপারবাগের আক্রমণে বিপন্ন শিশুরা
হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল এই গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন শিশুদের সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত করছে জটিল জীবাণু, যা মোট সংক্রমণের প্রায় ২৪.৫ শতাংশ।
বহুল ব্যবহৃত ইমিপেনেমের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৯৬.৭ শতাংশে এবং মেরোপেনেমের ক্ষেত্রে তা ৯৬.৪ শতাংশ। লেভোফ্লক্সাসিনের মতো ওষুধও ৮৪.২ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে।
এমনকি জীবনরক্ষাকারী হিসেবে পরিচিত টেইকোপ্লানিনের বিরুদ্ধেও ১৫.৮ শতাংশ জীবাণু ইতিমধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
পরিস্থিতির অবনতি আরও স্পষ্ট হয় সময়ের হিসাবে। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রথম সারির ছয়টি ওষুধের গড় প্রতিরোধের হার ছিল ৮৩.৮ শতাংশ, কিন্তু এপ্রিলে এসে তা এক লাফে পুরো ১০০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
এই তথ্য হাসপাতালে আসন্ন বড় বিপদের সংকেত দিচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
কেন এত ঝুঁকি?
গবেষণায় উঠে এসেছে ঝুঁকির কারণও। যেসব শিশু আগে কোনো না কোনো সময় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছে, তাদের শরীরে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি। এর প্রভাব পড়ছে চিকিৎসার সময়কালেও।
সাধারণ জীবাণুর সংক্রমণে একটি শিশু গড়ে ছয় দিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেও এই সুপারবাগে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে লাগছে দ্বিগুণ সময়।
এছাড়া যেসব শিশু ৪৮ ঘণ্টার বেশি ভেন্টিলেশনে থাকে বা দীর্ঘ সময় পিআইসিইউতে ভর্তি থাকে, তারাও এই মারাত্মক ঝুঁকির বাইরে নয়।
দায় কার?
গবেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে মূল কারণ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার।
সামান্য জ্বর বা ঠান্ডা-কাশিতেই চিকিৎসকের শরণ না নিয়ে সরাসরি ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে শিশুদের খাইয়ে দেওয়ার প্রবণতা এবং নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ না করার অভ্যাস এই পরিস্থিতি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
এই অসচেতনতাই জীবাণুকে আরও শক্তিশালী করে সুপারবাগে পরিণত করছে।
সমাধান কোন পথে?
এই গবেষণার পরিধি একটি হাসপাতাল ও ৪৯ জন শিশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গবেষক দল একে পুরো দেশের জন্য মারাত্মক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। সংকট মোকাবেলায় তারা জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা, হাসপাতালে কঠোরভাবে হাত ধোয়া ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখার নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা, শেষ ধাপের ওষুধগুলোর ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত করা এবং দেশব্যাপী সংকটের গভীরতা পর্যবেক্ষণে একটি জাতীয় তদারকি ব্যবস্থা চালু করা।
গবেষক দলের প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে শিশুদের এমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পরিচর্যার মধ্যে রাখা, যাতে তারা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মতো জটিল অসুস্থতাতেই না পড়ে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আজকের এই ছোট অসচেতনতাই আগামী দিনে শিশুদের জীবনকে মারাত্মক বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

